অদ্ভুত_মেয়ে (season 2) Part- 7

0
3036

অদ্ভুত_মেয়ে (season 2)
Part- 7
Writer: #Nur_Nafisa
.
.
(নাফিসা বউ সেজে বসে আছে। সব আয়োজন ভালোভাবেই হয়েছে । মেহমানদের আগমন নির্গমন চলছে। বরযাত্রী অর্থাৎ নানু বাসার সবাই এসে গেছে। কিন্তু ইমরানকে দেখা যাচ্ছে না। ইমরান এখনো আসেনি। এতো দেড়ি করছে কেন! সবার মুখে চিন্তার ছাপ! দুপুর, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে কিন্তু ইমরান আসেনি। নাফিসা ভয়ে আতঙ্কিত! সে কি আসবে না! পরিবারের সদস্যরা সবাই ফোনে খোঁজ নিতে ব্যস্ত। কেউ কোনো খবর পাচ্ছে না। লোকজন নানান কথা বলে যাচ্ছে! নাফিসাকেও বিভিন্ন কুসংস্কৃতিমূলক কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছে নাফিসার। ইমরান কেন এটা করলো! কেন এভাবে তাকে ধোকা দিলো!
ছটফট করতে করতে শোয়া থেকে চমকে উঠে বসলো নাফিসা। আশেপাশে তাকালো, বাইরের চাঁদের আলোতে স্পষ্ট বুঝতে পারলো সে তার রুমে আছে! হাত বাড়িয়ে লাইট জ্বালিয়ে জগ থেকে পানি খেলো সে। তারমানে এতোক্ষণ সে দুঃস্বপ্ন দেখছিলো! কিন্তু এমন স্বপ্ন কেন দেখলো ভেবে পাচ্ছে না সে। ইমরান ঠিক আছে তো! মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে নিলো আল্লাহ যেন সব ঠিক রাখে। লাইট অফ না করে আবার শুয়ে পড়লো। ঘুম আসছে না চোখে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করলো একটু পর ফজরের আযান শুনতে পেয়ে উঠে নামাজ আদায় করে নিলো। রুমের মধ্যে হাটাহাটি করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো। সাঈদের ডাকে ঘুম ভাঙলো।)
নাফিসা- এতো ডাকাডাকি করছিস কেন?
সাঈদ- ওদিকে সবাই চিন্তিত আর এখানে তুমি ঘুমাও!
নাফিসা- চিন্তিত মানে! কি হয়েছে?
সাঈদ- ইমরান ভাইয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
(নাফিসা লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। তার স্বপ্ন কি সত্যিই ঘটছে!)
নাফিসা- কিহ! কোথায় গেছে?
সাঈদ- আশ্চর্য! সেটা জানলে কি আর বলছি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
(নাফিসা নিজেই নিজেকে বোকা বলে পরিচয় দিলো। বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে কাউকে দেখছে না।)
সাঈদ- কাকে খুজো? মা বাবা সেই সকাল ৬টায় বেরিয়ে গেছে মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে।
(ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো এখন ৮টা বাজে! এতোক্ষণ ঘুমালো কিভাবে! এতো কিছু না ভেবে হিমাকে কল করলো।)
হিমা- আসসালামু আলাইকুম।
নাফিসা- ওয়ালাইকুম আসসালাম। হিমা, ভাইয়াকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?
হিমা- হ্যাঁ আপু।
নাফিসা- কখন থেকে?
হিমা- কাল থেকে।
নাফিসা- আমি চলে আসার পর আর বাসায় যায়নি ভাইয়া?
হিমা- হ্যাঁ এসেছিলো। কিন্তু আমি দেখিনি। স্কুলে ছিলাম। বড় চাচীর কাছে নাকি বলেছে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে না যাবে এসব কিছু বলেনি। দুপুরের দিকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেছে। এরপর থেকে ফোনও বন্ধ।
(ভাইয়া তো আর ছোট না যে হারিয়ে যাবে! কোনো ক্ষতি হয়নি তো! বিষয় গুলো খুব ভাবাচ্ছে নাফিসাকে! তারউপর আবার সেই স্বপ্ন! খুব ভয় লাগছে তার! ইচ্ছে করছে নারায়ণগঞ্জ যেতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কি করবে! কিছুই করতে পারবে না সে।আবার সাঈদ বাসায়। সাঈদের ক্লাস টেস্ট চলছে। কিচেনে গিয়ে হালকা নাস্তা রেডি করলো নাফিসা। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সাঈদ নাস্তা করে স্কুলে গেছে। নাফিসা সকালে নাস্তা বলতে এক গ্লাস পানি পান করেছে আর কিছু মুখে দেয়নি। বাসায় একা একা বসে আছে। আর একটু পরপর বাবার সাথে, আপুদের সাথে কথা বলছে। নাফিসা আর সাঈদ ছাড়া সবাই নারায়ণগঞ্জে। দুপুরে সাঈদ বাসায় আসার পর বাবাকে ফোন দিলে বাবা বলেছে সেখানে যেতে হবে না। ব্যস্ততার মাঝে বার বার ফোন করলেও বিরক্তিকর তাই ভেবে নাফিসা আর ফোন করেনি।কিন্তু একটু পর পর ইমরানের নম্বরে কল করেই যাচ্ছে। ফোন বন্ধ! কাল দুপুর থেকে আজ বিকেল হয়ে গেল কোন খোঁজ নেই ইমরানের। মাগরিবের আজানের একটু আগে ইমরানের নম্বর থেকে কল এলো নাফিসার ফোনে। স্ক্রিনে নামটা দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। চোখ মুছে নাফিসা দ্রুত রিসিভ করতে গিয়ে রিজেক্ট বাটন ক্লিক করে ফেলেছে। সাথে সাথে আবার সে ট্রাই করে দেখলো বিজি দেখাচ্ছে। বুঝতে বাকি রইলো না যে ইমরান বোধহয় আবার ট্রাই করছে। তাই আর ডায়াল না করে ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলো। ইমরান আবার কল করতেই নাফিসা এবার খুব সাবধানে রিসিভ করলো।)
নাফিসা- (কাপা কাপা কন্ঠে) হ্যালো…
ইমরান- আসসালামু আলাইকুম।
নাফিসা- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
ইমরান- কোথায় আছি একদম জিজ্ঞেস করবি না। বাসায় একা একা থাকায় ভয় পাচ্ছিস?
(এবার নাফিসা গেলো রেগে। আর চেচিয়ে বলতে লাগলো… )
নাফিসা- তুমি মানুষ নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী! বাসা থেকে এভাবে কাউকে না বলে চলে যাওয়ার মানে কি? সবার মাথায় যে মস্তিষ্ক আছে, আর সেখানে যে চিন্তার ভান্ডার গড়ে উঠেছে সে বিষয় কি তোমার অজানা! এতো বড় একটা ছেলে বাসা থেকে হুটহাট বেরিয়ে যাওয়া এসব কি? হ্যাঁ? বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকলে বাসায় বললেই হয়, এভাবে পালিয়ে যাওয়ার মানে কি! তোমাকে কি ধরে বেধে বিয়ে দিচ্ছে কেউ? যেই দেখছো বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে অমনি পালিয়ে গেলে ? একদিন পর এখন ফোন দিয়ে এখন আবার বলছো যাতে কোথায় আছো জিজ্ঞেস না করি! ঢং পেয়েছো এগুলো?
ইমরান- আস্তে! আস্তে! পাগলের মতো এসব কি বলছিস? আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি না এটা কে বললো তোকে? কথা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস! আর এতো প্রশ্ন একসাথে করলে জবাব দিবো কিভাবে!
( এবার নাফিসা চুপ করে রইলো। সত্যিই তো সে কি বলতে কি বলে ফেলছে!)
ইমরান- লাইনে আছিস?
নাফিসা- হুম বলো।
ইমরান- প্রথমত, আমি মানুষ আর ভিন নামে কোন গ্রহ আছে কি না আমার জানা নেই!
নাফিসা- (রেগে) ফাজলামো করো! তোমার উপর তো এখন তেলাপোকা ছাড়তে ইচ্ছা করতাছে!
ইমরান- হাহাহোহো… আচ্ছা তুই জমা করে রাখ, পরে ছেড়ে দিস। এখন আমাকে বলতে দে।
আমি মায়ের কাছে বলে এসেছি বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাবো। শুধু শুধু টেনশন করলে এখানে আমার কি দোষ!
নাফিসা- শুধু শুধু টেনশন করছে? কোথায় গিয়েছ সেটা বলছো? ফোন বন্ধ কেন তোমার?
ইমরান- আগে তোর মাথা ঠান্ডা কর। নেটওয়ার্ক প্রব্লেম তাই ফোন বন্ধ।
নাফিসা- কোথায় আছো?
ইমরান- প্রশ্ন টা করতে নিষেধ করেছিলাম।
নাফিসা- আচ্ছা, ঠিক আছো তো তুমি?
ইমরান- আলহামদুলিল্লাহ, একশো তে শতভাগ।
নাফিসা- হিহিহি… মামামামীর সাথে কথা বলো আগে।
ইমরান- বলেছি।
নাফিসা- কখন?
ইমরান- ওদের সাথে কথা বলেই তোকে কল করেছি।
নাফিসা- মাগরিবের আযান দিচ্ছে, রাখি এখন।
ইমরান- ওকে নামাজ পড়। ভয় পাস না, ফুপাফুপি হয়তো ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
নাফিসা- বাসায় একা একা থেকেছি অনেক। ভয় পাই না আর সাঈদ আছে সাথে। (মলিন স্বরে) একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম রাতে।
ইমরান- দুঃস্বপ্ন বলতে হয় না। আর যা ই দেখেছিস ভুলে যা। কথা এমন শুনা যাচ্ছে কেন? ক্ষুদার্থ তুই? লাঞ্চ করা হয়নি?
নাফিসা- ব্রেকফাস্টও না।
ইমরান- থাপ্পড় দিয়ে দাত ফেলতে ইচ্ছা করলেও এখন পারছি না। নামাজ পড়ে খেয়ে নে জলদি….
নাফিসা- হিহিহিহি….. ওকে, আল্লাহ হাফেজ।
ইমরান- খাবার না থাকলে সাঈদকে দোকানে পাঠা। আল্লাহ হাফেজ।
(প্রায় ১ঘন্টা পর নাফিসার বাবা মা এলো বাসায়।)
মা- ইমরানকে পাওয়া গেছে।
নাফিসা- কোথায় পেয়েছো? খাটের নিচে নাকি আলমারির ভেতর থেকে?
(নাফিসার কথা শুনে মা রেগেমেগে তাকালো)
মা- একটা মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তাই সবাই চিন্তিত আর এদিকে তোর ফাজলামোর শেষ নেই! তোর বাবা তো দুপুরে বলেছিলো নাফিসাও বাসায় বসে বসে চিন্তা করছে, আমি তো তোর মধ্যে চিন্তার রেশটুকুও দেখছি না!
নাফিসা- হয়েছে হয়েছে, জানি আমি। ভাইয়া বন্ধুদের সাথে বেড়াতে গেছে।
মা- কিভাবে জানলি তুই?
নাফিসা- মাগরিবের সময় ভাইয়া ফোন করেছিলো। তা তোমার ভাইয়া ভাবিরা এতো বলদ কেন! বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিতে গেলেও তো জেনে যেত তারা সবাই একসাথে আছে।
মা- খোঁজ না নিয়ে কি বসে ছিলো! খোঁজ নিয়ে দেখে সবার বাড়িতে একই অবস্থা! কেউ তাদের ছেলের খবর জানে না। ইমরানের মামাতো ভাই রাফসান ও সাথে।
নাফিসা- রাফসান যেহেতু ভাইয়ার বন্ধু সেহেতু থাকবেই সাথে।
মা- অনেক বেশি বকবক করতে জানিস। যা পড়তে বস।
নাফিসা- ইয়েস! আমিই তোমার বস!!! হিহিহিহি…..
(নাফিসা আর সাঈদ পড়ছিলো। হঠাৎ নাফিসার মা তেড়ে এই রুমে এলো।)
নাফিসা- আবার কি হলো তোমার?
মা- তুই মানুষ না আরো কিছু! সারাদিন না খেয়ে কাটালি কিভাবে! রান্না করতে জানিস না? নাকি তোর বাবার আয় করছিস না খেয়ে? কোনটা? ঘরে তো মুড়ি, বিস্কুট ও ছিলো। এসব খাওয়া যেত না?
(মায়ের চেচামেচি শুনে পাশের রুম থেকে বাবাও এসে পড়েছে!)
বাবা- কি হয়েছে?
মা- তোমার মেয়ের কান্ড দেখো, সারাদিন একফোঁটা পানিও খায়নি। ইমরান এখন কল করে না বললে তো জানতামই না!
নাফিসা- মা, সারাদিনে আমি ৩/৪ গ্লাস পানি খাইছি।
মা- (রেগে) থাপ্পড় দিবো একটা! চিন্তা কি তোর একাই ছিলো! আমরা চিন্তা করিনি! তাই বলে কি না খেয়ে আছি!
নাফিসা- (মনে মনে) এতোক্ষণ বললো চিন্তার রেশটুকুও নাই আমার মধ্যে! এখন আবার বলে চিন্তা আমি একাই করছি!
বাবা- সাঈদ না দুপুরে বললো নুডুলস খাইছে !
সাঈদ- নুডুলস আমি একা খাইছি। সকালে আপু এক প্যাকেট রান্না করছে। ওটার অর্ধেক খেয়ে স্কুলে গেছি, বাসায় ফিরে আপু বলছে খাবে না তাই আবার বাকি অর্ধেকও আমি খাইছি।
বাবা- ভালোই তো আয় করতে শিখে গেছে আমার মেয়ে! তুমি এখানে দাড়িয়ে আছো কেন? রান্না বসাও।
মা- ভাত বসাইছি। এখনো বসে আছে! বই রেখে আয় আমার সাথে।
( মা আরো নানান কথা শুনিয়ে বকা দিতে দিতে রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে গেলো। নাফিসাও বই রেখে মনে মনে ইমরানকে বকা দিতে দিতে মায়ের পিছু পিছু বেরিয়ে গেলো।)
নাফিসা- ইমরাইন্নার বাচ্চা! বাড়িতে থাকতেও শান্তি দেছ না! দূরে থেকেও বকা শুনাছ! ভালোয় ভালোয় ফিরে আয়। আচ্ছা জব্দ করবো তোকে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here