কৈশোরে প্রেম অংশ: ১৬,১৭

0
1995

কৈশোরে প্রেম
অংশ: ১৬,১৭
লিখা: বর্ণালি সোহানা
অংশ: ১৬

প্রহেলির হাতটা শক্ত করে ধরে দিব্য। হাতটা যেন ভরসা দিয়ে বলছে, “ভয় পেও না চন্দ্রমল্লিকা, আমি তো আছি। তোমার কিচ্ছু হতে দিব না। সব ঠিক করে দিব।”

তার হাতের দিকে একবার তাকিয়ে মুখের উপর চোখ ফিরিয়ে নেয়। দিব্য তার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলে আশ্বস্ত করে।

নাহিয়ান প্রহেলির সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলল, “আমাকে বিয়ে করেছ, এখন অন্য কাউকে বিয়ে করে তার জীবন নষ্ট করতে যাচ্ছ! তোমার কী একটুও মন কাঁদে না? আমি তোমার থেকে আলাদা হয়েছি এর মানে এই নয় যে তোমাকে ভালোবাসা ছেড়ে দিয়েছি। আমার ভালোবাসার ভিক্ষে চাচ্ছি তোমার কাছে, ফিরে এসো প্লিজ।”

নাহিয়ানের চোখে জল। প্রহেলি কখনো তাকে কাঁদতে দেখেনি। নাহিয়ানের চোখের জল তার ভেতরটাকে যেন ভেঙেচুরে দিচ্ছে। তার চোখেও জল টলমল করছে। চোখের পাতা এক করলেই তারা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে। মায়ের দিকে দৃষ্টি পড়তেই বুকটা ধরে আসে তার। আরফা খাতুন হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। পরক্ষণেই শামসুল গাজীর দিকে তাকায়।

তিনি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, “এসব কী বলছে মামণি? আমরা তো তোমার পছন্দ মেনে নিয়েছিলাম। চেয়েও ছিলাম তোমাকে তোমার পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে। তুমিই তো বললে এই ছেলে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে। এখন সে এসব কেন বলছে? কিসের বিয়ের কথা বলছে সে?”

প্রহেলির গলা দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। বাবার কথার উত্তর কীভাবে দেবে সে! সেদিন যে নাহিয়ান এই বিয়েকে অস্বীকার করেছিল, মিথ্যে বলেছিল আজ আবার সেই বিয়ের দোহাই দিতে এসেছে। সে আসলে কী চায়!

প্রহেলি কিছু বলার আগে নাহিয়ান আরেকটু কাছে যায়। প্রহেলির হাতটা ধরতে চাইলেই দিব্য তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

মাথাটা নিচের দিকে নিয়ে ভ্রু চুলকে বলে, “কিসের বিয়ের কথা বলছেন আপনি? কিসের ভিত্তিতে বলছেন? আপনার কাছে কী কোনো প্রমাণ আছে?”

নাহিয়ান দু’কদম পিছিয়ে যায়। কোনো কথা না বলে পেপারটা সামনে ধরে। দিব্য পেপারটা হাতে নিয়ে এক পলক দেখে নেয়৷ তারপর মোবাইল বের করে কাকে যেন কল করে বলে চলে আসতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একজন কালো কোট পরা ব্যক্তি এসে হাজির হোন। মনে হচ্ছিল তিনি বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবাই হতবাক হয়ে আছে। এখানে কী হচ্ছে কেউ বুঝতে পারছে না৷

কালো কোট পরা ব্যক্তি পেপার চেক করে বললেন, “পেপারটা নকল। এই বিয়ে হয়নি। তাছাড়া এখানে কনের সাইনও তো নেই৷ নিশ্চয়ই উনার মাথা নষ্ট তাই এসব উলটা পালটা কথা বলছেন।”

নাহিয়ান তেড়ে এসে বলল, “কীসব আজেবাজে কথা বলছেন? আমার আর প্রহেলির বিয়ে হয়েছে। রাহী দেখ কী বলছে এরা!”

উকিল বন্ধুর দিকে তাকায় সে। পেপারটা টান দিয়ে নিজের হাতে নিয়ে দেখে আসলেই প্রহেলির সাইন নেই কাগজে। এটা দেখামাত্র তার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। কীভাবে হয়ে গেল এটা! রাহীর কাছে ছুটে গিয়ে পেপার দেখায়।

সে দেখে বলল, “এই একটা কপিই ছিল যা আমি তোকে দিয়েছিলাম। তুই কী করেছিস আমি তো জানি না। দেখ আমার যা করার আমি করেছি। এখন এসব তোর ব্যক্তিগত বিষয় আমি এসবে নেই। আমি বরং আসি এখন।”

কথাটা বলে রাহী এক পলক দিব্যের দিকে তাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। প্রহেলি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিব্যের দিকে। সাইন তো সে নিজ হাতেই করেছিল। তাহলে পেপারে কেন সাইন নেই! কীভাবে কী হয়ে গেল সবকিছু তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

দিব্য ক্ষীণ হেসে বলল, “আমি জানি আপনি স্কুল লাইফ থেকেই প্রহেলির সর্বনাশ করার একটা সুযোগও হাতছাড়া করেননি। কিন্তু এবার আর সেই সুযোগ পাবেন না মি. নাহিয়ান। আপনি এখন এখান থেকে যাবেন নাকি আমি পুলিশ ডাকবো? আশা করি আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে।”

নাহিয়ান গর্জে উঠে বলে, “আমার সাথে বেঈমানী! তুই তোর ক্ষমতা খাটিয়ে এসব করেছিস তাই না? আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো। যে বা যারা জড়িত আছে এই প্রতারণায় আমি তাদের কাউকে ছাড়বো না।”

শামসুল গাজী এগিয়ে বলেন, “ভদ্রভাবে কথা বলো। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।”

“বাবা তুমি একে ভদ্রতা শিখিয়ে লাভ নেই। এই শালা ভালো কথা কানে নেওয়ার নয়। একে তো আমি তার মতো করেই সোজা করবো।”, বলেই প্রান্ত নাহিয়ানের কলার ধরে টেনে নিয়ে যায়।

নাহিয়ান কোনোমতেই যেতে চাচ্ছে না। দরজার কাছে এসেও চিৎকার করে বলছে, “প্রহেলি প্লিজ ফিরে এসো, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমাকে একবার ক্ষমা করে দাও। ভুল করেছি আমি আর কখনো হবে না। তুমি চাইলে সব ঠিক করে দিব আমি।”

প্রহেলি কেবল তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে। না পারছে নাহিয়ানকে আটকাতে আর না পারছে কোনো কথা বলতে। মনে হচ্ছে বুকের উপর ভারি কোনো পাথর রাখা। এতকিছুর পরেও সে নাহিয়ানকে ভুলতে পারছে না। বারবার ইচ্ছে করে তার কাছেই ছুটে যেতে। কিন্তু সে এখন আর চাইলেও তা করতে পারবে না। ভালোবাসার উপর থেকে একবার বিশ্বাস উঠে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাছাড়া প্রহেলির কাছে তার বাবা বড় ভালোবাসার মানুষ নয়।

দিব্য প্রহেলির হাতে আংটি পরানোর জন্য বক্স খুলতে গেলেই তার মা বলেন, “বাবা, আরেকবার ভেবে নে। যা কিছু রটে তার কিছু তো ঘটে। পরে যেন তোকে পস্তাতে না হয়। মা হয়ে ছেলের ভালোই চাই আমি।”

দিব্য তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “যা ভাবার তা অনেক বছর আগেই ভেবে নিয়েছিলাম না। এখন কেবল তা আমলে নিচ্ছি। তোমাদের দোয়া থাকলেই হবে আর কিছু চাই না। জেনে রেখ তোমাদের ছেলে ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।”

মৃদু হাসেন তার মা। ছেলের খুশিতেই তার খুশি। সন্তান বড় হয়ে গেলে কোনো বিষয়ে জোড়াজুড়ি করতে নেই। তাদের উপর কিছু চাপিয়ে দিতে নেই। তবে তিনি এই বিয়েতে যে খুব খুশি তাও নয়। তবুও ছেলের মন রাখতে রাজী হয়েছেন।

আংটিটা সামনে ধরে জিজ্ঞেস করে, “আংটি পরানোর অনুমতি কী পাওয়া যাবে মহারানী?”

প্রহেলি খালি গলায় ঢোক গিলে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। সাথে সাথে দিব্য আংটিটা পরিয়ে নেয়। প্রহেলিও তাকে কম্পিত হাতে আংটি পরায়। ফটোগ্রাফার ইচ্ছেমতো ছবি তোলে তাদের। খাওয়া-দাওয়ার অধ্যায় শুরু করতেই প্রহেলি বারান্দায় চলে যায়। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না তার। কেমন দম বন্ধ লাগছে। একটু বাইরের বাতাসে প্রাণভরে নিশ্বাস নিতে চায়। দিব্য এসে তার পাশে কখন দাঁড়ায় সে খেয়ালই করেনি। প্রহেলি চোখ বন্ধ করে বাইরের হিমেল বাতাস অনুভব করছে। দিব্য তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কী সুন্দর, নিষ্পাপ মুখখানা। ইচ্ছে করছে এখনই ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু সেই অধিকার বা অনুমতি কোনোটাই এখনো তার হয়নি। তবে আজকে তো প্রহেলিকে অর্ধেকটা নিজের করে নিয়েছে এই সপ্তাহেই সে তাকে পুরোটা নিজের করে নেবে।

“ভালোবাসি…চন্দমল্লিকা”

কেঁপে উঠে চোখ মেলে তাকায় প্রহেলি। কেমন নেশা ধরানো কণ্ঠে ভালোবাসি কথাটা শুনছে সে। কত জীবন পর শুনেছে তাও মনে নেই। বুকের ভেতর একটা শীতল অনুভূতি বয়ে যায়।

“তুই যা করছিস তা কী ঠিক করছিস? এসব কীভাবে করলি? আর এসবের মানেই বা কী? কেন এমন করছিস?”

“বিয়ের পরেও কী আমাকে তুই করে বলবে?”

“সবসময় প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন কেন করিস? কখনো উত্তর দিলেও তো পারিস।”

“একটা জিনিসের অনুমতি দিলে উত্তর দিব।”

“কিসের অনুমতি?”

দিয়ান তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “একটু ছুঁয়ে দেওয়ার।”

প্রহেলির হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। খানিকটা দূরে সরে যায় তার থেকে। দিব্য আরো কাছে এগিয়ে যায়। এভাবে অনুমতি চাইলে কী উত্তর দিতে হয় সে জানে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। দিব্য তার একটা হাত ধরে নিজের বুকের উপর রাখে।

“আমার হৃদস্পন্দন কী শুনতে পাও না তুমি? প্রতিটি স্পন্দন কেবল প্রহু প্রহু বলে। আমি তোমাকে প্রহু বলে ডাকতে চাই। কিন্তু কেন জানি পারি না আমি। কিসের একটা বাঁধা কাজ করে। সত্যি বলছি প্রহু, তোমাকে খুব ভালোবাসি।”

দিব্য তার আরো কাছে আসে। প্রহেলি পেছনে যেতে যেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। দু’হাতে আগলে দাঁড়ায় সে।

প্রহেলি ইতস্তত করে বলল, “দেখ, আমার সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করিস না। আমি শুধু আমার পরিবারের কথা ভেবে এই বিয়েতে মত দিয়েছি। তোকে কোনোদিনও ভালোবাসতে পারবো না আমি। এমনকি আমার থেকে কোনো আশাও রাখিস না তুই। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে আমি নাইয়ানকে ভালোবেসেছি আর তাকে কোনোদিন ভুলতে পারবো না। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি ভার্জিন নই।”

দিব্য আরো কাছে এগিয়ে আসে। একদম মুখের কাছে আসতেই প্রহেলি দু’হাত তার বুকের উপর রেখে নিজের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বাঁধা দিতেই হোক, প্রহেলি তাকে স্পর্শ করেছে। অন্তত এই আনন্দ নিয়ে সে আরো কয়েক বছর কাটিয়ে দিতে পারবে। এভাবে যদি প্রতিদিন একবার ছুঁয়ে দেয় তাহলে প্রতিদিন সে একবার করে কাছে আসবে। তাতে সে তাকে খারাপ ভাবলে ভাবুক।

দোলা হুড়মুড়িয়ে বারান্দায় ছুটে আসে। সাথে সাথে সে প্রহেলিকে ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। ছোট বোনের সামনে এভাবে ধরা খেতে হবে ভাবেনি সে। লজ্জায় মুখটা আরক্ত হয়। প্রহেলি ভাবে সে এই যাত্রায় বেঁচে গেছে। কিন্তু দিব্য যে অন্য কিছু ভেবে রেখেছে তা সে আঁচও করতে পারেনি।

দুইদিন পর তাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়। দিব্য দেরি করতে চাচ্ছে না। সবাই প্রথমে এতে রাজী হচ্ছিল না কিন্তু কনেপক্ষের দিক থেকে প্রান্ত আর বরপক্ষের দিক থেকে সোহেল রহমান রাজী হয়ে যান। তারা সবকিছু সামলে নেবে। একদিনেও বিয়ে সম্ভব। প্রহেলির মাথাটা ঝিম ধরে আছে। কেমন দ্রুত সবকিছু হয়ে যাচ্ছে। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল কিছুই বুঝতে পারছে না। দিব্যকে সব সত্য বলার পরেও কেন এই বিয়ে করতে সে রাজী হলো। একটু বসে কথাও বলতে পারে না। সবাই বিদায় নিচ্ছিলেন। তখন দিব্য বলল, প্রহেলির সাথে দুইটা কথা বলতে চায় সে। এটা কেন জানি আশ্চর্যকর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এতক্ষণ কোনো কথা না বলে যাওয়ার সময় কথা বলতে চাচ্ছে। দিব্যকে কথা বলার জন্য প্রহেলির সাথে তার রুমে পাঠানো হয়।

চলবে…

কৈশোরে প্রেম
অংশ: ১৭

“তুমি ছিলে ঠিক রানী মৌমাছির মতো। যার পেছনে স্কুলের এক ঝাঁক ছেলে মৌমাছি ঘুরে বেড়াতো। আমিও ওই এক ঝাঁকের একজন ছিলাম যার উপর কখনো তোমার নজর পড়েনি। তবে এতে আমার আফসোস বা কষ্ট নেই। কেন জানো? কারণ, এক তরফা প্রেমিক হওয়ার মধ্যেও একটা শান্তি আছে। আমি তোমার এক তরফা প্রেমিক ছিলাম, আর কল্পনা জুড়ে তুমি ছিলে আমার প্রেমিকা।”, বলেই থামে দিব্য।

প্রহেলি এক কোণে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটা কথাও বলছে না। কেবল শুনে যাচ্ছে। দিব্য তার বিছানায় একটু আয়েশ করে বসে।

তারপর বলে, “বিশ্বাস করো আমি কখনোই একা ছিলাম না। যখন যেভাবে চেয়েছি আমি আমার রানী মৌমাছিকে ঠিক সেভাবেই পেয়েছি। একা একা কথা বলতে দেখলে আমার রুমমেটরা অনেকেই আমাকে পাগল প্রেমিক বলতো। আমি হাসতাম, এসব কথা কানে নিতাম না। ভাবতে পারো কতটা ভালোবেসেছি তোমায়? কতটা ভালোবাসলে তোমাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একা একাই কথা বলা যায় জানো তুমি?”

এতক্ষণ পর প্রহেলি মুখ খুলে। তার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি তোর ভালোবাসার যোগ্য না। তুই যেভাবে আমাকে ভালোবেসেছিস সেটা আসলেই পাগলামো। আমার মনে দূর দূরান্তে ছিলি না। আমি ভুল নয় পাপ করেছি। আমাকে তোর জীবনের সাথে জড়িয়ে কেন নিজেকেও পাপের ভাগীদার করতে চাচ্ছিস?”

দিব্য মৃদু হাসে। রুমের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। আবহাওয়া কিছুটা গুমট বেধে রয়। প্রহেলির ফোন একসাথে বেশ কয়েকবার টুংটাং শব্দ করে উঠে। মোবাইল চেক করে দেখে মেসেজ এসেছে। নাহিয়ানের মেসেজ! কিছুটা অবাক হয় সে। ফেইসবুকে তাকে ব্লক করেছিল। আনব্লক করে এখন আবার মেসেজ করেছে।

“মি. নাহিয়ান মেসেজ করেছেন তাই না?”, সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে প্রহেলির দিকে।

প্রহেলি মোবাইলটা তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। দিব্য বসা থেকে দাঁড়িয়ে তার কাছে আসে। মোবাইলটা নিয়ে সাইড টেবিলে রেখে দেয়। একদম চোখের দিকে তাকায়। প্রহেলির দৃষ্টি নিচের দিকে। সে তার একটা গালের মধ্যে হাত রেখে বৃদ্ধাঙুলি দিয়ে আলতো ঘষে বলল, “তোমার উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আমাকে তার মেসেজ দেখাতে হবে না।”

দিব্যকে নিজের এতটা কাছে মানতে পারছে না প্রহেলি। সে কাছে আসলেই নাহিয়ানের কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবনের প্রথম ভালোবাসা কী আর এত দ্রুত ভুলতে পারা যায়! নাহিয়ানের কথা মনে হলেই কেমন অস্থিরতা বেড়ে যায়। কষ্ট গলা চেপে ধরে। দিব্য তার আরো কাছে আসে। বুকটা ধুকপুক শব্দ করছে। পুরুষ মানুষের কী শরীর ছুঁয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই চাই না! মনটা কী তাদের কাছে কখনোই জরুরি নয়? প্রশ্নটা মনে আসলে মুখে আসে না প্রহেলির। দিব্য তার কপালে নিজের কপাল ঠেকায়। সাথে সাথে প্রহেলি ভয়ে কেঁপে উঠে। তার বুকে দু’হাত ঠেকিয়ে নিজের থেকে দূরে ঠেলে। দিব্য এটাই আশা করছিল। তার সম্পূর্ণ মুখে আনন্দের হাসি ছড়িয়ে পড়ে। এই ছোঁয়াটা তার অনেক পছন্দের হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কখনোই প্রহেলির শরীর চায় না। তার মনে কেবল নিজের ভালোবাসার গাঢ় চিহ্ন এঁকে দিতে চায়। যাতে কেউ আর চাইলেও মুছে দিতে পারে না।

মৃদু হেসে ক্ষীণ গলায় বলল, “গভীর সাগরে বহমান জলের মতো, অসীম আকাশের অসমাপ্ত নীলের মতো, পৃথিবীর বুকে শীতল পবনের মতো ভালোবাসি তোমায়। তুমি কখনো আকাশ, কখনো সাগর কখনোবা আমার পৃথিবী।”

প্রহেলির হাতের দিকে খানিক্ষণ তাকিয়ে দূরে সরে যায় সে। এই মেয়েটার জন্য সে এত পাগল কেন! ইচ্ছে করে সারাদিন সামনে বসে দেখতেই থাকুক। কিন্তু এখন আর সময় নেই। তবে আর মাত্র দু’দিন তারপরেই নিজের করে নিয়ে যাবে তাকে। যতক্ষণ না সাধ মিটছে ততক্ষণ দেখতেই থাকবে। ভাবতেই ভেতরটা সিক্ত হয়ে আসছে তার।

“আজ যাই তাহলে। দু’দিন পর বর সেজে আসবব। তৈরি থেক। তোমাকে কিন্তু আমার কোলে করে তুলে নিয়ে যাব।”

উত্তরের অপেক্ষা না করে উড়ন্ত চুমু তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে। মনটা ভীষণ খুশি লাগছে।

নাহিয়ান রাহীর বাসায় এসে গালমন্দ করেছে। জিনিসপত্র ভাংচুর করে গেছে। বন্ধু হয়ে বন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সাথে। রাস্তার পাশে বসে মেসেঞ্জারে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে প্রহেলিকে। কতটা মেসেজ করেছে তার কোনো হিসেব নেই। প্রত্যেকটা মেসেজে মাফ চাইছে তার কাছে বারবার। ভালোবাসার ভিক্ষে চাচ্ছে। সে তার কাজের জন্য অনুতপ্ত। প্রহেলির মোবাইল সাইড টেবিলের উপর যেভাবে ছিল সেভাবেই পড়ে আছে। একবারও মেসেজ বা কল দেখেনি সে। বসে বসে কাঁদছে তবু কেন জানি সে আর আগের মতো নাহিয়ানের ডাকে সাড়া দিতে পারছে না। বাবা, মা ভাইয়ের মুখটা ভেসে আসছে চোখের সামনে। দিব্যের বলা কথা, তার এত বছরের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এতটা ত্যাগ সবকিছু মাথায় গিজগিজ করছে। অন্য কিছু ভাবার সুযোগ পাচ্ছে না। নাহিয়ান তো তাকে এভাবে ভালোবাসেনি অথচ সে নাহিয়ানকে ভালোবেসে নিজেকে ভুলতে বসেছিল।

কখন ঘুমিয়ে পড়ে কিছু বলতেই পারে না। সন্ধ্যা ছয়টায় ঘুম ভাঙে যায় প্রহেলির। সারাটা দিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কেবল ঘুমিয়েছে। ফোন বের করে দেখে নাহিয়ান তাকে অসংখ্য কল আর মেসেজ দিয়েছে। লাস্ট মেসেজে লিখা, “আমি কাল সকাল সাতটায় তোমার জন্য ধানমন্ডি লেকে অপেক্ষা করব। তুমি না এলে আটটায় আমার মৃত্যুর খবর পাবে।”

মেসেজ পেতেই মাথাটা এলোমেলো হয়ে যায় তার। আসলেই যদি নাহিয়ান এমন কিছু করে নেয় তবে এই অনুশোচনা নিয়ে সে কীভাবে বাঁচবে! সারাটা রাত চিন্তায় ঘুম আসে না তার। সকাল বেলা রুমের ভেতর পায়চারি করছে। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাটা সাতটা ত্রিশে এসে ঠেকে। আর অপেক্ষা করতে পারে না সে৷ পূজাকে ছোট্ট একটা মেসেজ করে বেরিয়ে যায়। ধানমন্ডি লেকে এসে দেখে নাহিয়ান বসে বসে ঘাস ছিঁড়ছে। পেছনে এসে আবার ফিরে যেতে চায় তখনই সে তাকে দেখে ফেলে।

দৌড়ে এসে পথ আগলে ধরে বলে, “আমি জানতাম তুমি আসবে। তুমি এখনো আমাকেই ভালোবাসো। এসে আবার ফিরে যাচ্ছিলে কেন?”

প্রহেলি দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “এটা আপনার ভুল ধারণা মি. নাহিয়ান। আমি আপনাকে ভালোবাসতাম। এখন আর ভালোবাসি না। আমাকে এখানে ডাকার কারণটা কী? আর এভাবে মৃত্যুর হুমকি দেখিয়ে কী প্রমাণ করতে চান?”

সে এগিয়ে তার দু’হাত ধরে বলে, “তুমি যদি আমাকে ভালো নাই বাসো তাহলে কেন আমার মৃত্যুর ভয়ে এভাবে ছুটে এসেছ? বলো প্রহেলি বলো।”

“ছাড়ো আমাকে। তোমার একটুও লজ্জা করে না? তোমার নতুন গার্লফ্রেন্ড, কী যেন নাম! ওহ হ্যাঁ, রাইমা। তাকে কী ছেড়ে দিয়েছ? স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেছে বুঝি?”

“তুমি যা বলার বলে নাও আমাকে। আমি মাথা পেতে সকল অপবাদ সইবো। কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না। রাইমা আমার ভালোবাসা ছিল না। জাস্ট একটা অ্যাট্রাকশন ছিল। বিশ্বাস করো তোমাকে হারানোর পর প্রতিটা মূহুর্তে আমি তুমিহীনতায় কষ্ট পেয়েছি। তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। প্লিজ ফিরে আসো।”

নাহিয়ানের চোখে জল। প্রহেলিও অঝোরে কাঁদছে। নাহিয়ানের হাতটা ছাড়িয়ে খানিকটা দূরে সরে বলল, “এটা আর হয় না নাহিয়ান। আমি আমার মাকে কথা দিয়েছি তাদের পছন্দেই বিয়ে করবো।”

“একবার আমরা বিয়েটা করে নিই, তাদেরকে রাজী করানোর দায়িত্ব আমার। তুমি ওসব নিয়ে ভেবো না।”

প্রহেলি নাহিয়ানের কথায় চিন্তায় পড়ে যায়৷ কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। নাহিয়ান আবার বলল, “আমি তোমাকে আর জোর করবো না। মানুষ ভুল করে এবং সময় থাকতে তার অনুশোচনা করলে মাফ করে দেওয়া উচিত। আজকের দিনটা তুমি ভাবো। তারপর সিদ্ধান্ত নেও। আজ রাত দশটায় আমি এখানেই অপেক্ষা করবো। আশা করি তুমি আসবে।”

নাহিয়ান আর কোনো কথা বলে না। চোখের জল মুছে চলে যায়। প্রহেলি সেখানেই বসে রয়। সে কী আসলেই বদলে গেছে নাকি সবই তার সাজানো-গোছানো নাটক। আগের মতো মিথ্যে বলছে না তো! নীরব পানির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে।

“নিজের সিদ্ধান্তের উপর সন্দেহ হচ্ছে?”

পরিচিত কণ্ঠ শুনে পেছন ফিরে তাকায় প্রহেলি। দিব্য পকেটে হাত রেখে পানির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে এখানে কীভাবে এলো! নিশ্চয়ই পূজা তার কথা বলেছে। প্রহেলি চোখের জল মুছে ইতস্তত করে বলল, “আমি জানি না কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল। শুধু জানি আমি আমার পরিবারকে হারাতে চাই না। আমার বাবা-মাকে কষ্ট দিতে চাই না।”

“তোমার কাছে আজ রাত অবধি সময় আছে। আগামীকাল সকালে আমি বর সেজে আসবো ঠিকই। সিদ্ধান্ত তোমার, তুমি বউ সেজে আমার জন্য অপেক্ষা করবে নাকি নাহিয়ানের হাত ধরে নতুন সংসার শুরু করবে।”

দিব্যের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা অবাক হয় প্রহেলি। সে যাকে চেনে তার সাথে কোনো মিল পাচ্ছে না তার। এত বছরের একতরফা ভালোবাসাকে যখন পেতে চলল তখন কেউ এভাবেই ছেড়ে দিতে রাজী হয়ে যেতে পারে কেবল প্রিয় মানুষটার খুশির জন্যে! অন্যদিকে নাহিয়ান এত কষ্ট দেওয়ার পরে যখন সে নতুনভাবে জীবনে আগাতে চাচ্ছে তখন আবার এসেছে তাকে ফিরিয়ে নিতে! এমনকি তার পরিবারের কথাও ভাবছে না। দিব্য নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয় যতক্ষণ প্রহেলি বসেছিল। তাকে একা এখানে আর বসে থাকতে দেয় না। নিজের গাড়িতে তাকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে বলে, “এদিকটা আমি সামলে নেব। তুমি কেবল নিজের কথা ভাবো। ভালোবাসা বারবার আসে না। খুব সৌভাগ্যবান তারা যারা ভালোবাসা পায়। নয়তো কেউ কেউ আছে যারা একা একাই ভালোবেসে যায় বিনিময়ে কখনোই ভালোবাসা পায় না।”

মৃদু হেসে চোখে কালো চশমা পরে গাড়ি ছেড়ে চলে যায় দিব্য। চোখের জলটা আর তাকে দেখাতে চায় না সে। চশমাটা ঝাপসা হয়ে আসতে কিছুদূর এসে খুলে নেয়। একটা বাইকের সাথে এক্সিডেন্ট হতে হতে বেঁচে যায়। জীবনটা হয়তো অনেক লম্বা। অনেক কিছুই পাওয়ার বাকি তাই তো বেঁচে গেল।

চারদিকে ঘর সাজানো হয়েছে। তেমন কোনো আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করা হয়নি। দুই পরিবার মিলে ছোটখাটো একটা আয়োজনের মাধ্যমে বিয়ের কাজ সেড়ে নেবে। দিব্য বর সেজেছে। নিজেকে আয়নায় দেখছে। সাদা শেরওয়ানিতে আকর্ষণীয় এক যুবক। কতশত মেয়েদের ক্রাশ। পৃথিবীর প্রথম কোনো পুরুষ হয়তো ভয় নিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে। আজ তার বিয়ে হবে নাকি হবে না। প্রহেলির সাথে তার আর কোনো কথাই হয়নি। যদি আজ বিয়ে হয় তাহলে প্রহেলিকে কালো লেহেঙ্গাতে কেমন লাগছে কল্পনা করার চেষ্টা করছে সে। আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতেই দোলার ডাক পড়ে। প্রহেলিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় তারা।

বাড়ির ভেতর ঢুকতে ভয় পাচ্ছে দিব্য। ভেতরটা কাঁপছে। খুব বেশি গরম নেই, শীত পড়ছে পড়ছে সময়। অথচ এই সময়েও সে ঘামছে।

দোলা মজা করে বলল, “ভাইয়া, এভাবে কেন ঘামছিস? ভয় পাচ্ছিস? তোর বউ আবার পালিয়ে যায়নি তো?”

হাসির রোল পড়ে যায় সবার মধ্যে। কেবল দিব্যই হাসতে পারে না। বরণ করে ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজী এসে পড়েন। কনেকে আনতে পূজাকে পাঠানো হয়।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here