কৈশোরে প্রেম অংশ: ২০,২১

0
2979

কৈশোরে প্রেম
অংশ: ২০,২১
লিখা: বর্ণালি সোহানা
অংশ: ২০

“শেষমেশ মায়ের বয়সী মেয়েকে বিয়ে করলেন দিয়ান রহমান দিব্য।”

ফেইসবুকে ঢুকে একটা ধাক্কা খায় দিব্য। তার আর প্রহেলিকে নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক কথা ছড়িয়ে আছে। মিডিয়ার নিউজের মন্তব্যের বক্স ভরে আছে খারাপ মন্তব্যে। মাথাটা ধরে যায়। রাগে গা কাঁপছে তার। মানুষ এত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কীভাবে করে! নিজেকে সামলে ফেইসবুক থেকে বেরিয়ে আসে। এই মিডিয়ার একটা কর্মকর্তাকেও সে ছাড়বে না।

নাহিয়ান সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি। প্রহেলিকে সে কিছুতেই সুখে থাকতে দেবে না। তার ভালোবাসাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিব্যকে বেছে নিয়েছে! এটার শাস্তি প্রহেলি একা নয় দিব্যকেও পেতে হবে। এমন শাস্তি দেবে যে দিব্যের শোকে আজীবন কান্না করবে সে। জেদ মানুষকে ভুল, শুদ্ধের মধ্যকার পার্থক্য ভুলিয়ে দেয়। নাহিয়ানও এখন তাই করছে।

প্রহেলিকে মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠায়, “দিব্যকে কীভাবে বাঁচাও দেখে নেব আমি। আজ থেকে ধ্বংসের খেলায় নেমে গেলাম। যার দ্বারপ্রান্তে দিব্য দাঁড়িয়ে।”

মেসেজ পাওয়া মাত্র প্রহেলি তাকে ব্লক করে দেয়। দিব্যের কিছু হবে না তো! চিন্তা আর ভয় দুটোই বেড়ে যায়। দিব্যকে কিছুই বলে না সে। বললে হিতে বিপরীত হতে পারে। এসব সাতপাঁচ ভাবনা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।

সকালের নাস্তা তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে দেয়৷ সবাই তার রান্নার তারিফ করে। এমনকি দিব্যের মা ফাহিমা বেগমও। ছেলের বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে খুশি খুশি হয়ে গেছেন তিনি। কথায় আছে মানুষের মনের রাস্তা পেটের মধ্য দিয়ে যায় এই কথাটা আজ সত্যিকার অর্থে বাস্তবে প্রকাশ পেল। উপহারস্বরুপ তাকে স্বর্ণের আংটি পরিয়ে দেন।

সোহেল রহমান বললেন, “আমি আগামীকাল সারপ্রাইজ দেব তোমাদের দু’জনকে। আজকের দিন অপেক্ষা করো। কিন্তু দিব্য তুই বউমার জন্য কিছু আনিসনি?”

দিব্য খাওয়া বন্ধ করে বলল, “না তো কী দেব আবার!”

বলেই আবার খেতে শুরু করে। বিয়ের রাতেই সে প্রহেলিকে একটা উপহার দিতে চেয়েছিল কিন্তু সুযোগের অভাবে সেটা দিতে পারেনি। আজ সেটা তাকে দেবে। নিজের আনা উপহার পকেটেই রেখে দেয়। সবার সামনে দিতে চায় না।

প্রহেলি জন্য গলার চেইন এনেছে। রুমে এসে বের করে কয়েকবার চোখ বুলায়। দেখেই চোখের সাথে মনের মধ্যেও একটা শান্তি পাচ্ছে। লকেটে ProDib লেখা। দু’জনের নামের অক্ষর যুক্ত করে বানিয়েছে। দু’জনকে যেন খোদা দু’জনের জন্যেই বানিয়েছেন।

রান্নাঘরের সবকিছু গুছিয়ে সে রুমে আসতেই দিব্য তাকে টেনে আয়নার সামনে নিয়ে দাঁড় করায়।

“কী হলো? এভাবে কেউ টেনে আনে?”

“আমি আনি। এই যে আনলাম। এবার চুপ করে দাঁড়াও।”

প্রহেলি সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আয়নায় তার পেছিনে দিব্যকে দেখতে পাচ্ছে। সে হাতের চেইনটা তার গলায় পরিয়ে দেওয়ার জন্য খোলা চুল একপাশে নিয়ে রাখে। তারপর চেইন পরিয়ে দেয়। প্রহেলির মুখে আনন্দ ফুটে উঠে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা দেখা যায়। দিব্য আচমকা তার পিঠে আলতো করে ঠোঁটের উষ্ণতা মেখে দেয়। কেঁপে উঠে উলটো দিকে ফিরে আয়নার সাথে মিশে যায় প্রহেলি।

“ক…কী করছিস!”, দ্রুত নিশ্বাস ফেলছে সে।

দিব্য কাছে এসে বলল, “কেন করতে পারি না? আমার বুঝি অধিকার নেই? আমি তো বারবার ছুঁয়ে দিতে চাই। সময়ে, অসময়ে ছুঁয়ে দিতে চাই।”

“ক’টাদিনই তো চাইলাম। ভালো না বেসে কী শরীর ছুঁয়ে দেওয়াটাই জরুরি হয়ে…”, বলতে বলতেই থেমে যায় প্রহেলি।

দিব্য মন খারাপ করে না। আসলেই তো তার ভালোবাসাটা আগে জরুরি। যে মনে ভালোবাসা থাকবে সেই মন কেন সেই মনের মানুষটাও সম্পূর্ণ তার হয়ে থাকবে। ভালোবাসায় তো শরীর জরুরি নয় মনটাই আগে জরুরি।

রেস্টুরেন্টের একটা টেবিলের কোণে বসে আছে প্রহেলি। দিব্য তাকে নিয়ে এসেছে তার বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। সে আসতে চাচ্ছিল না কিন্তু তার কথাও ফেলতে পারলো না। দিব্য তার বন্ধুদের সাথে কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ প্রহেলির কানে একটা কথা ভেসে আসে।

“কিরে অবশেষে তুই কি না এই মেয়েকে বিয়ে করলি! তাকে তো তোর বড় বোন মনে হচ্ছে!”

“আরে না, বড় বোন নয়, বল মা ছেলে দেখা যাচ্ছে তাদের।”

একসাথে হাসিতে ফেটে পড়ে দিব্যের বন্ধুরা। প্রহেলি চুপচাপ টেবিলের কোণে বসে সব কথা শুনেও না শোনার ভান করে আছে কিনু দিব্য না শুনে থাকতে পারে না। যে বন্ধু এইসব কথা বলছিল তাদের কলার চেপে ধরে। কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দেয়। প্রহেলি দৌড়ে এসে আটকায় তাকে। তার হাতের বাঁধনে শক্ত করে আটকে ধরে।

দিব্য চেঁচিয়ে বলে উঠে, “একদম মুখ সামলে কথা বলবি। লজ্জা করে না তোদের বডি শেইমিং করতে? তোরা না আবার একেক জন ভালো ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছিস! এই তোদের জ্ঞান? তোদের জ্ঞানের পরিধি এত কম হলে মানুষকে কী শিখাবি তোরা?”

সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। দিব্য প্রহেলিকে নিয়ে তাদের সাথে দেখা করতে এসেছিল। তেমন কাউকে বিয়েতে দাওয়াত করতে পারেনি। ইচ্ছে ছিল গেট টুগেদার করে সবাইকে তার জীবনসঙ্গিনীকে দেখাতে। যাকে পাওয়ার জন্য সে পাগল প্রেমিক ছিল। আর এখন পাগল স্বামী হয়ে রইবে। কারো কথার ধার ধারে না সে। তাকে নিয়ে কে কী ভাবলো বা কে কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু প্রহেলিকে নিয়ে কেউ একটা বাজে শব্দ বলতে পারবে না। প্রয়োজনে তাকে খুন করে জেলে যাবে সে। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেছে তার।

প্রহেলির হাত ছুটিয়ে তাদের কাছে তেড়ে গিয়ে বলল, “আমার বউ যেমনই হোক সে আমার কাছে রানীর মতো হয়ে থাকবে। আমি তাকে যে-কোনো রূপে ভালবাসবো। তার জন্য আমি নিজেকে উজাড় করে দিব। কেউ তাকে নিয়ে একটা কথা বললে জিভ ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিব। কথাটা মাথায় রাখিস। তোদের বন্ধু ভেবেছিলাম আজ প্রমাণ করে দিলি তোরা এসবের যোগ্য না।”

হনহনিয়ে প্রহেলির হাত টেনে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে সে। প্রহেলির চোখের মণিজোড়া স্থির নিষ্পলক। দিব্যকে এ কোন নতুন রূপে দেখল সে! তাকে কখনো এর রাগতে দেখেনি সে। কান লাল লাল হয়ে আছে। রাগের মধ্যে অপূর্ব সুন্দর লাগছে তাকে। কানের পাশ বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। গায়ের শার্ট অনেকটাই ভিজে এসেছে। রাস্তার পাশে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ঘুষি মারতে নিলেই প্রহেলি নিজের হাত মধ্যিখানে ঢুকিয়ে দেয়৷ আচমকা এমন কিছু ঘটে যাবে বুঝতেই পারেনি। ব্যথায় চোখ বন্ধ করে নেয় সে। দিব্য তার হাতটা ধরে পাগলের মতো ঘষতে লাগে।

অস্থির হয়ে বলল, “তুমি এত পাগল কেন! কেন এভাবে হাত ঢুকালে! এখন কত ব্যথা পেলে দেখ! একবার নিজের কথা ভাববে না? এতবড় সাহস কীভাবে হয় নিজেকে কষ্ট দেওয়ার? জানো না, এখন তোমার সাথে আমার সবকিছু জড়িত। তোমার কষ্ট মানেই আমার কষ্ট।”

“তুই কেন ভেতরে আমার জন্য মারপিট করতে গেলি? যা সত্যি তারা তো তাই বলছিল। মিথ্যে কিছুই তো বলেনি। আমি মোটা, বয়সে এমনিতেও তোর থেকে দু’বছরের বড়। মোটা হওয়ায় এখন দশ বছরের বড় দেখা যায়। শরীরের আকার আকৃতি সব নষ্ট হয়ে গেছে। চেহারাতেও সেই লাবণ্যটা আগের মতো নেই। তাহলে কেন এভাবে রিয়েক্ট করলি? আমার জন্য বন্ধুত্বটা নষ্ট হলো না তোদের?” ব্যথা সহ্য করে প্রহেলি বলল।

দিব্যের এসব কথায় কোনো মনোযোগ নেই। প্রহেলিফ হাতে বারবার ফুঁ দিচ্ছে। প্রহেলি তার কাঁধে হাত রেখে আলতো করে গালের নিচে গভীর চুমু খেল। সাথে সাথে সে শান্ত হয়ে আসে। প্রহেলির হাতটা এখনো তার হাতেই রয়েছে। কখনো ভাবেওনি এভাবে মেঘ না চাইতেই সে বৃষ্টি পেয়ে যাবে। দিব্য তার হাতে ব্যথার স্থানে আলতোভাবে ঠোঁটের স্পর্শ করায়। ব্যথায় চোখ কুঁচকে বন্ধ করে নেয়। তবে তার মুখে লজ্জা ভর করে। মুখ খানিকটা আরক্ত হয়।

“দিনের শুরুটা অসাধারণ ছিল, মধ্যভাগ খারাপ কিন্তু এখন অনেক অনেক বেশি সুখময় শেষটা ইনশাআল্লাহ খুব সুন্দর হবে।”, বলেই দিব্য প্রহেলির কপাল থেকে হাত ছুঁইয়ে থুতনিতে রাখে।

কিছুক্ষণ পর আবারো জিজ্ঞেস করলো, “হাতে ব্যথা পাচ্ছ অনেক না?”

প্রহেলি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে না করে। দিব্যকে সে আর চিন্তিত করতে চাইছে না। কিন্তু ব্যথায় তার হাত টনটন করছে। বিষয়টা দিব্য তার মুখের দিকে তাকিয়েই আঁচ করে। মুখের কথার উপর বিশ্বাস না করে, চোখের ভাষায় উত্তর খুঁজে নেয়। হন্তদন্ত হয়ে গাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল বের করে কিন্তু বোতলে পানি নেই। দৌড়ে রাস্তার ওপর পাশের দোকানে পানি কিনতে যায়। প্রহেলি তার পিছু পিছু ছুটে।

“দিব্য থাম, আমার কিছুই হয়নি। কেন পাগলামি করছিস।”

আচমকা একটা গাড়ি বেগতিক দিব্যের দিকে তেড়ে আসে। প্রহেলির চোখ যেতেই দৌড়ে যায় দিব্যের কাছে। দিব্যের কিছুই হতে দেবে না সে। শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে তাকে দূরে ফেলে দেয়। গাড়িটা প্রহেলিকে টক্কর মেরে হনহনিয়ে চলে যায়। সে ছিঁটকে পড়ে রাস্তার মধ্যে। মাথা খানিকটা ফেটে রক্ত বেরিয়ে যায়। একটা হাত আর পা অবশ লাগছে তার। চোখে ঝাপসা দেখছে। মনে হচ্ছে এই যাত্রায় বাঁচবে না সে। এই ফাঁকা রাস্তায় তেমন বেশি মানুষজন নেই। দোকানী দৌড়ে এসে দিব্যকে তুলে। গাড়ির নম্বর প্লেট দেখার আগেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

দিব্য প্রহেলির মাথা কোলে তুলে নেয়। চিৎকার করে কান্না করছে।

“এটা কী হয়ে গেল রে! খোদা…! এই প্রহু, এই, এই চোখ খোলা রাখ। একদম বন্ধ করবে না। তোমার কিচ্ছু হবে না। এই আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে কিচ্ছু হতে দিব না।”

দোকানী পুলিশকে কল করে। দিব্য তাকে কোলে করে গাড়িতে তুলে নেয়। দোকানের লোকটা গাড়ি ড্রাইভ করে সোজা হাসপাতালে এসে পৌঁছায়। সাথে সাথে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দিব্য পরিচিত মুখ থাকায় ভর্তি করে দেয় রোগীকে। তাছাড়া দোকানী তাদেরকে জানায় সে পুলিশে খবর দিয়ে দিয়েছে। দিব্য ফ্লোরে বসে চোখের জল মুছছে। রক্তে তার শার্ট লাল হয়ে আছে। কেন যে আজ তাকে নিয়ে বেরিয়েছিল! কেন যে এত রাগ দেখিয়েছিল। সবকিছু তার জন্য হয়েছে।

প্রহেলি আর দিব্যের পরিবারের সবাই কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে যান। প্রহেলির মা-বাবার কান্না যেন ধরছে না। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দুইদিন হলো না একটা অঘটন ঘটে গেল। অপারেশন তখনও চলছে। দোকানের লোকটা দিব্যের কাছে গিয়ে বলল, “ভাইয়া, এই এক্সিডেন্টটা কেউ ইচ্ছাকৃত করেছে। আপনি একটু খোঁজ নিয়ে দেইখেন। আজ পর্যন্ত আমার দোকানের সামনে কোনো এক্সিডেন্ট হয়নি। শহরের বাইরে ছোট এই রাস্তায় এক্সিডেন্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে আমার।”

দোকানীর কথাগুলো দিব্যকে ভাবনায় ফেলে দেয়। আসলেই এটা কোনো চিন্তাভাবনা করে করানো এক্সিডেন্ট নয় তো! উত্তর দিব্যের জানা না থাকলেও প্রহেলির ঠিকই জানা আছে।

চলবে…

কৈশোরে প্রেম
অংশ: ২১

পুলিশ এসে হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করছে। দিব্যকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিল কিন্তু সোহেল রহমান অনুরোধ করায় আপাতত কিছুই জিজ্ঞেস করে না। প্রহেলির রক্তাক্ত শরীরের কথা তার বারবার চোখের সামনে ভেসে আসছে। দিব্য নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না। মাথাটা ঝিম ধরে আছে তার। নিষ্পলক চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। গাল বেয়ে পড়ছে অজস্র অশ্রু। ডাক্তারকে বেরিয়ে আসতে দেখে হাসপাতালের মেঝে থেকে দ্রুত উঠে তার কাছে ছুটে যায়।

কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ডাক্তার বললেন, “ডোন্ট ওয়ারি, প্রেশেন্ট ইজ আউট অফ ডেঞ্জার। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে কেবিনে পাঠানো হবে। তবে…”

“তবে কী ডাক্তার?” সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিব্য।

“প্রেশেন্টকে অন্তত দুই মাস বেড রেস্টে থাকতে হবে। যথেষ্ট কেয়ার নিতে হবে আপনাকে তার। আসলে তার পায়ের একটা আঙুল থেতলে গিয়েছিল প্রায়। হাঁটতে কষ্ট হতে পারে। আর কোনো সমস্যা হলে যোগাযোগ করবেন।”, বলেই ডাক্তার চলে গেলেন।

এখন কাউকে দেখা করতে দেওয়া হয় না তার সাথে। কেবিনে পাঠানোর পর দেখা করতে হবে। বিশ মিনিটের মাথায় প্রহেলিকে কেবিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ হাতে, কপালে, পায়ের হাঁটুতে আর আঙুলে ব্যান্ডেজ করা। মুখটা একদম শুকনো হয়ে আছে তার। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। চোখের কোণে পানি। দিব্য তার একটা হাত ধরে পাশে বসে আছে। সবাই তাকে দেখতে এক এক করে কেবিনে আসে৷ পুলিশ একবার দেখা করে দিব্যের সাথে কথা বলে চলে যায়। জ্ঞান ফিরলে আসবে দেখা করতে।

রাত নয়টার দিকে জ্ঞান ফিরে আসে তার। নার্স পুলিশকে কল করে দেয়। প্রহেলির এখনো স্যালাইন চলছে। কিছুই খায়নি সে। দিব্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। জ্ঞান ফেরার পর সে একটুও কথা বলেনি। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রাখছে তো কিছুক্ষণ পরপর পিটপিট করে তাকাচ্ছে।

পুলিশ আসতেই দিব্য প্রহেলিকে ডেকে তোলে। চোখ খুলে পুলিশ দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যায় সে৷ দিব্য তাকে স্বস্তি দিয়ে পাশেই বসে রয়।

প্রহেলির কাছে তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “আপনার স্বামীর ভাষ্যমতে এটা কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং খুনের চেষ্টা করা হয়েছে। আপনি কী জানেন কে বা কারা এমন করেছে আপনার সাথে? নাকি এটা সত্যিই কোনো এক্সডেন্ট ছিল?”

প্রহেলি দিব্যের হাতটা শক্ত করে ধরে ক্ষীণ গলায় বলল, “আমার মোবাইল কোথায়?”

দিব্য তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেয়৷ মোবাইলটা আগে থেকেই তার কাছে ছিল। প্রহেলি মোবাইলের মেসেজে গিয়ে নাহিয়ানের মেসেজটা পায় না। মেসেজ রিমুভ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রহেলি বুদ্ধি করে স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিল। সেটা বের করে পুলিশের দিকে এগিয়ে দেয়।

তারপর বলে, “আসলে স্যার, ওই গাড়ি আমাকে মারতে চায়নি। দিব্যকে মারতে চেয়েছিল। গাড়িতে আর কেউ নয় বরং আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড নাহিয়ানকে দেখেছি আমি। আপনি দ্রুত কিছু করুন। দিব্যের জীবিন সংকট রয়েছে।”

পুলিশ প্রহেলির মোবাইলটা প্রমাণ হিসেবে তাদের কাছে নিয়ে নেয়। একাউন্ট থেকে মেসেজ রিকোভারের কাজ করবে তারা। স্ক্রিনশটের উপরে ভিত্তি করে কাজ করতে পারবে না। এমন ফেইক স্ক্রিনশট এখন অহরহ বানানো যায়। তবু কেউ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে মিথ্যে বলবে না। এই বিশ্বাসে কেইসে আগাবে বলে আশ্বাস জানায় তাদের।

যাওয়ার আগে পুলিশ দরজার কাছে থেমে বলল, “আপনি এ যুগের স্ত্রীদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে কতটা ভালোবাসলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাঁচিয়ে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেয় আমার জানা নেই। শুধু চাইবো আপনারা সুখী হোন, অনেক বেশি সুখী। ভালোবাসা এভাবেই থাকুক। আর দিব্য সাহেব, খেয়াল রাখবেন। আমরা কেইসে আজই আগাচ্ছি। আপনার সাথে যোগাযোগ করব।”

পুলিশ চলে যেতেই বাকিরাও বাইরে চলে যায়। হাসপাতালে বেশি মানুষ থাকা যাবে না। এর মধ্যেই এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে পূজা চলে এসেছে। বাইরে কেবল পূজা আর দিব্যের বোন দোলা আর প্রান্ত বসে। বাকিদের জোর করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। দিব্য প্রহেলির দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। এতবড় একটা কথা সে তার থেকে কীভাবে লুকালো!

“তুমি কেন এমন করলে? মরে গেলে আমি মরতা…”

কথাটা সম্পূর্ণ করতে দেয় না প্রহেলি। এক হাতে তার মুখ চেপে ধরে। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মুখে হাত রেখেই বলল, “আর একবারও এসব বলবি না। আমিই তোকে মেরে ফেলব। আমার জীবনে আমি ভালোবাসা পাইনি। একবার পেয়েছি আর হারাতে দিব না।”

দিব্যের ইচ্ছে করছে প্রহেলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু ব্যথা পাবে ভেবে জড়িয়ে ধরে না। মুখটা কাছে নিয়ে বলে, “এত ভালোবাসা দিব যে, ভালোবাসারও হিংসে হবে, কেন এত ভালোবাসি তোমায়!”

কোমল ঠোঁটের উষ্ণতা মেখে দেয় প্রহেলির চোখের পাতায়। নাকে নাক ঘষে গালে আলতো করে চুমু খায়। প্রহেলি তাকে বাঁধা দেয় না। চোখ বন্ধ করে পড়ে রয়। এভাবেই কতক্ষণ কেটে যায় দু’জনার।

“আমার তোমাকে খুব কাছে চাই, যতটা কাছে আসলে বিন্দু পরিমাণ ফাঁকা থাকবে না আমাদের মাঝে। চোখ খুলে তাকাও। একটু আমার দিকে তাকাও।”, বলেই দিব্য প্রহেলির দু’গাল ধরে থাকে।

সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। দিব্যকে এতটা কাছে দেখতে পেয়ে নিঃশ্বাস আটকে আসে তার। ঠোঁট কাঁপছে। দিব্যের চোখ তার ঠোঁটের উপর এসে ঠেকেছে। এই ঠোঁট জোড়া খুব করে কাছে টানছে তাকে। বৃদ্ধাঙুলি দিয়ে ঠোঁটের উপর ছুঁয়ে দেয়।

“পানি খাব।”, কম্পিত কণ্ঠে বলল প্রহেলি।

দিব্যের কানে যেন কথাটা পৌঁছে না। সে নিজের ঠোঁট তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে যেতেই প্রহেলি মুখটা অন্যপাশে সরিয়ে নেয়। দিব্য মৃদু হেসে তার চিবুকে গভীর চুমু খায়।

“আমি কাছে আসলে কী তোমার খারাপ লাগে? যদি তাই হয় তবে এভাবে আর আসব না কাছে। স্যরি, রাগ করো না তবুও।”

প্রহেলি আবার বলে, “পানি খাব।”

“চাইলে তো আমাকেই খেতে পারতে আর তুমি কি না পানি খেতে চাচ্ছ! ভিজিয়ে দিতাম তোমার শুষ্ক কোমল ঠোঁটের পাতা।”

দিব্যের কথায় প্রহেলির বুকের কম্পন বেড়ে যায়। হাসপাতালে এসে এই ছেলে যেন বেশি উতলা হয়ে গেছে। একগাল হেসে প্রহেলির উপর থেকে সরে গিয়ে সাইড টেবিল থেকে পানি আনে। তার মাথা খানিকটা তুলে ধরে খাইয়ে দেয়।

হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে আজ তারা বাড়িতে ফিরল। একা হাঁটতে পারে না প্রহেলি। কারো সাহায্য প্রয়োজন হয়। দিব্য তাকে কোলে করে নিয়ে এসেছে। রুমের ভেতর আসতেই চমকে উঠে তারা। ভেতরটাকে দোলা নিজ হাতে সাজিয়েছে। কোনোভাবেই যাতে প্রহেলি মনে না করে সে অসুস্থ। সম্পূর্ণ মেঝেতে যেন শিউলি ফুলের গালিছা বিছানো। দেয়ালে বেলুন ঝুলিয়ে দিয়েছে। মাঝখানে “Welcome” লিখা। হলুদ রঙের মরিচ বাতি জ্বলছে। বিছানার একপাশে টব ভর্তি কমলা রঙের জার্বেরা ফুল আর অন্যপাশে ঝুড়ি ভর্তি ফল। বিছানাটা বেশ পরিপাটি। সন্ধ্যার নীরবতায় শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধে মন ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে। মোহনীয় সুবাসে মন যেন ভরে উঠেছে।

পুলিশ দুই দিনের মধ্যে মেসেজ রিকোভার করে আজ নাহিয়ানের বাড়িতে আসে তার খোঁজ করতে৷ বাসায় এসে ভিন্ন কাহিনী জানতে পারে তারা। নাহিয়ান এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে। হাসপাতালে গিয়ে নিজেই অবাক হয়ে যায় তারা। নাহিয়ান কথা বলার মতো অবস্থানে নেই৷ এক্সিডেন্টে তার শরীরের একটা দিক প্যারালাইজড হয়ে গেছে। সেদিন কেবল প্রহেলির এক্সিডেন্ট হয়নি। গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নাহিয়ানও এক্সিডেন্ট করেছে। এক্সিডেন্টের পূর্ব মুহূর্তে ভয়ে স্টক করে বসে সে। মুখটা বেঁকে গেছে। ডাক্তার কয়েকটি থেরাপি দিয়েছে তাকে। আর বলেছে ঠিক হবে কি না সেটা সম্পূর্ণই আল্লাহর ইচ্ছে। খবরটা পেয়ে পুলিশ দিব্যকে কল করে। প্রহেলিকে মাত্র বিছানায় নামিয়েছে সে। তখনই ফোনটা বেজে উঠে। পুলিশের কল দেখে রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে আসে। সব কথা শুনে সে পুলিশকে কেইস বন্ধ করতে বলে দেয়। প্রহেলি যাতে এসব কিছু জানতে না পারে সেটারও অনুরোধ করে।

রুমে এসে প্রহেলিকে জিজ্ঞেস করল, “ফ্রেশ হয়ে নিবে? কাপড় ভিজিয়ে গা মুছে নাও একটু ভালো লাগবে। আর মাথায় পানি দিয়ে নিবা হালকা লাগবে শরীর।”

“দোলাকে একটু ডেকে দাও তুমি।”

দিব্য নড়েচড়ে উঠল। ভ্রুজোড়া ঈষৎ কুঁচকে তাকায় প্রহেলির দিকে। সম্পূর্ণ মুখে অপূর্ব এক আনন্দ তার। দ্রুত তার কাছে ছুটে এসে বলল, “আমাকে ‘তুমি’ করে বললে! অবশেষে! কী যে ভালো লাগছে আমার। ইয়েএ!”

প্রহেলিকে কোলে তুলে একটা চক্কর দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। আনন্দ ধরে রাখতে পারছে না সে। ইচ্ছে করছে আজ সবাইকে মিষ্টিমুখ করাক। করলোও তাই। প্রান্ত নিচেই বসেছিল। দৌড়ে গিয়ে প্রান্তকে বলল, “ভাইয়া, এই নেন আমার ক্রেডিট কার্ড। আজ পুরো এলাকায় মিষ্টি বিতরণ হবে। ভালো দেখে এক মণ মিষ্টি নিয়ে আসবেন।”

সবাই অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কী এমন হলো যে সে এত খুশি। সবার চোখেই প্রশ্ন।

প্রান্ত জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু এত মিষ্টি কী উপলক্ষে?”

সে ইতস্তত করে উত্তর দিল, “আসলে, প্রহু সুস্থ সবল বাড়িতে ফিরেছে তাই। আপনি এত প্রশ্ন করলে হয় নাকি? এই দায়িত্ব আপনি ছাড়া আর কেউ পালন করতে পারবে না। প্লিজ ভাইয়া যান।”

প্রান্ত তার এই ছেলেমানুষিতে যোগ দেয়। সত্যি সত্যি মিষ্টি এনে পুরো এলাকায় বিতরণ করিয়ে দেয়। প্রহেলিকে দোলা এই কথা বলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল তখনই দিব্য রুমে আসে।

“তুই এখানে কী করছিস? যা এখান থেকে।”, বলেই দোলার মাথার চুল টেনে দেয় দিব্য।

“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি থাকলে তো তোমার যত সমস্যা। বুঝি না? বুঝি আমি। তোমাদের ইয়ে করায় বাঁধা আমি।”

দিব্য চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে, “ইয়ে করায় মানে! এই বুড়ি এসব কী বলছে!”

“সত্যিই বলছি। ইয়ে মানে ইয়ে আরকি। রোমান্টিকতা।”

“আচ্ছা! তোর কী মনে হয়, তুই সামনে থাকলে আমি আমার বউয়ের সাথে তোর সেই ইয়ে করতে পারব না?”, বলেই প্রহেলির গালে চুমু খেয়ে বসে দিব্য।

যতটা আশ্চর্য দোলা হয় তার থেকে বেশি অবাক হয় প্রহেলি। লজ্জায় মুখ কোথায় লুকাবে ভেবে পায় না। দোলা তখনই পালিয়ে যায়৷

“তোমার লজ্জা শরম কিছুই নেই? এভাবে ছোট বোনের সামনে এসব করে কেউ?”, অপূর্ব ভঙ্গিতে শাসায় সে।

দিব্য ক্ষীণ হেসে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী ছোট বোনের আড়ালে করব? পারমিশন দিচ্ছ তুমি?”

“আ…আমি সেটাও বলিনি।”, ভয়ে গলায় কথা আটকে যায় তার।

দিব্য সশব্দে হেসে দেয়। হাসির সাথে সম্পূর্ণ শরীর দুলে উঠে তার। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর এসে পড়েছে। সে কী অপরূপ এক দৃশ্য। প্রহেলির চোখ জুড়িয়ে যায়। এই দিব্যের প্রেমে পড়ে যায় সে। প্রেমে পড়ার জন্য কয়েক মাস বা যুগ নয় একটা মুহূর্তই যথেষ্ট। প্রহেলির কাছে এই সেই উত্তম মুহূর্ত। অপলক তাকিয়ে থাকে কেবল। কোনো ছেলের হাসি এতটা নিষ্পাপ লাগেনি তার কাছে। ভয়ংকর সুন্দর তার হাসি! এই বাচ্চা বাচ্চা চেহারার ছেলেটা তাকে ভালোবাসে, শুধুই তাকে।

“এভাবে কী দেখছ?”

দিব্যের কথায় ঘোর কাটে প্রহেলির। দৃষ্টি নামিয়ে নিজেকে সংযত করে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “দোলা চলে গেল, ফ্রেশ হবো কীভাবে! একটু ডেকে আনো না।”

“ওরে আমার সোনারে! এভাবে বললে তো কলিজা জুড়িয়ে যায়।”

“এখন আবার দয়া করে আরো এক মণ মিষ্টি বিতরণ করতে চলে যেও না। আমি ফ্রেশ হবো দোলাকে ডেকে দিলেই খুশি হবো।”

দিব্য তার কাছে এসে বলল, “আমার বউকে আমি ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ তো দূরের কথা নারীও দেখতে পারবে না। আমি মুছে দিব তোমার শরীর।”

কথাটা শুনে গলা শুকিয়ে আসে তার। বুকে যেন কেউ পাথর রেখে দিয়েছে। নিজেকে আর সামলাতে পারে না। চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ে।

তার চোখে জল দেখে দিব্যের বুকটা কেঁপে উঠে। কিছুক্ষণ আগের আনন্দ মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। দ্রুত তার জল মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এই প্রহু! স্যরি আমি ভুল কিছু বলে থাকলে। ক্ষমা করে দাও প্লিজ। প্লিজ কেঁদো না এভাবে। আচ্ছা আমি তোমার শরীর মুছে দিব না। এখনই দোলাকে ডেকে আনছি। প্লিজ চুপ করো। এই যে যাচ্ছি আমি…।”

সে যেতে চাইলেই প্রহেলি তার একটা হাত ধরে ফেলে। অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে?”

সাথে সাথে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে। প্রহেলির কান্নার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। শব্দ করে কেঁদে উঠে। দিব্য কিছুই বুঝতে পারছে না সে কেন কাঁদছে।

কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে সে বলল, “আমাকে মাফ করে দাও। আমি খুব খারাপ। আমার মতো খারাপ মেয়ে তোমার যোগ্য না দিব্য। তুমি কত ভালো। আমাকে পাগলের মতো ভালোবেসে গিয়েছ। কেবল ভালোবাসোনি, সেই সাথে নিজেকে সংযত রেখেছ। কখনো কোনো প্রেম করোনি। আর আমি প্রেম তো করেছি আর নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি অন্য পুরুষের সামনে। আমি খুব খারাপ দিব্য, এই শরীরটা যে অন্য কেউ দেখেছে। আমি যে ভার্জিন নই। আমি একটা নির্লজ্জ মেয়ে, চরিত্রহীন মেয়ে।”

দিব্য প্রহেলিকে নিজের বুক থেকে তুলে সোজা করে বসিয়ে দেয়। দু’বাহু ধরে বলল, “আজ বলেছ, ছেড়ে দিলাম। আজকের পর থেকে যদি এসব কথা শুনি তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কিছুই হবে না বলে দিলাম।”

প্রহেলি যেন তার কোনো কথাই শুনছে না। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বলল, “শোন, তুমি আমাকে তালাক দিয়ে দাও। তুমি আরো অনেক ভালো কেউ…”

প্রহেলির গালে চড় বসিয়ে দেয় সে। হুংকার দিয়ে বলল, “একবার না বলেছি আর এইসব আজেবাজে কথা মুখে না আনতে? তাও কেন এসব কথা হ্যাঁ? যে মেয়েরা নিষিদ্ধ গলিতে শত পুরুষের সাথে শুয়ে বেড়ায় তারা পেটের টানে করে। আর তুমি যা করেছ তা ভালোবাসা নামক মিথ্যে মায়ায় পড়ে করেছ। আমি মানি সেটা তোমার ভুল ছিল, দোষ কিন্তু একা তোমার ছিল না। বিছানায় তোমাকে যে নিয়ে গেছে সেও তো একজন পুরুষ ছিল। কই সে কী তোমার মতো আফসোস করে মরছে? না, ওইসব পুরুষ কখনোই আফসোস করে না। তুমি তো সেই ভুল পথ থেকে ফিরে এসেছ। নিজেকে শুধরেছ। তাহলে কেন এসব কথা? নিজের পাপ নিজেকেই ঢেকে রাখতে হয়। ক্ষমা চাওয়ার হলে উপরওয়ালার কাছে ক্ষমা চাইবে। তিনি ক্ষমা করলে করতেও পারেন, আমার কাছে কেন?”

রাগে কাঁপছে দিব্য। এদিক সেদিক পায়চারি করে কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “শোন, মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। আর তুমি কোনো খাদ্যদ্রব্য নয় যে একবার খেয়ে দিলে তার স্বাদ নষ্ট হয়ে পচে যাবে। তুমি ওই চাঁদের মতো। যে প্রতিনিয়ত আমার কাছে নতুন নতুন রূপে ধরা দেবে। আর আমি তোমার মাঝে ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় নতুনত্ব খুঁজে নিব।”

প্রহেলি গালে হাত দিয়ে বসে কেবল দিব্যের বলা কথাগুলো শুনছে। এই সেই ছোট্ট দিব্য যে এত বড় বড় কথা বলছে! বিশ্বাস হচ্ছে না তার। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আচমকা সে তাকে কোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে ঢুকে। আগে থেকেই সেখানে একটা উঁচু টুল রাখা ছিল। টুলে বসিয়ে দিয়ে আলতো করে তার পরনের ড্রেস না খুলে উপর উপর দিয়ে মুছতে লাগে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দিব্য হাত দিচ্ছে দেখে লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে প্রহেলি। কিন্তু দিব্য একটা কথাও বলে না। একবারের জন্য প্রহেলির চোখের দিকেও তাকায় না সে। আলতো হাতে গা মুছে দেয় যাতে কাটা জায়গায় ব্যথা না পায়। মাথাটা ঈষৎ হেলিয়ে পানি ঢেলে টাওয়েল দিয়ে মুছে দেয়। ওয়ারড্রব থেকে একটা পেটিকোট আর ব্লাউজ এনে পরে নিতে বলে। সেও তার কথামতো তাই করে। কিন্তু দিব্য শাড়ি আনেনি। এই প্রথম প্রহেলি শাড়ি পরতে চলেছে। অথচ কেবল ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে বসে আছে। দিব্য তাকে এভাবেই কোলে করে রুমে নিয়ে আসে। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নেয়। ঠান্ডা যাতে না লাগে রুমের হিটার চালু করে। ব্যান্ডেজগুলো খুলে আবার নতুন ব্যান্ডেজ করে। এত চুপচাপ, এত গম্ভীত কীভাবে এসব করছে সে! অবাক না হয়ে পারে না প্রহেলি। এদিকে নিজের দিকে তাকাতেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে সে।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here