জ্বীনবর,পর্বঃ ০৮ এবং শেষ পর্ব
Writer: Asstha Rahman
বাবার বাসা থেকে আসার পর আমাদের আর কোনো সমস্যা হয়নি। খুব সুন্দর সংসার সাজিয়েছিলাম দুজন মিলে। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল। সকালটা শুরু হত কপালে উনার ঠোঁটের স্পর্শে ঘুম ভেঙে, সারাটাদিন খুন সুটি তে কাটতো, পালা করে এক একেকদিন একজন অপরজনকে খাইয়ে দিতাম, সন্ধ্যায় ছাদে বসে চাঁদ দেখতে দেখতে উনার কাধে মাথা রেখে নানারকম গল্প জুড়ে দিতাম, রাতে উনার বুকে মাথা রেখে না ঘুমালে ঘুমই আসতোনা। মাঝে মাঝে নিজেকে নিজের হিংসে হত এত ভালো কেয়ারিং স্বামীর ভালোবাসা পেয়ে।
এত সুখের সংসার আরো খুশি বয়ে এনে দিল আমার একটি সুসংবাদ। আমি মা হতে চলেছি। উনাকে জানানোমাত্রই উনি প্রথমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। পরে আমাকে কোলে তুলে বললেন,
— মুশায়রা তুমি আমাকে কতটা খুশি করেছো তোমাকে বলে বুঝাতে পারবনা।
— আপনার খুশি দেখে আমারো অনেক খুশি লাগছে। এখন আমাকে কোল থেকে নামান। আমার ভয় লাগছে , পড়ে যাব তো।
— পড়বেনা ভীতুনি। আমার তো ইচ্ছে করছে তোমাকে বুকের কোঠোরে লুকিয়ে রাখি।
— লুকোবেন কেন? প্রশ্নটা শুনে উনার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পেলাম। উনার এমন মুখ দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। তাই উনাকে খুশি করার জন্য বললাম,
— আমাদের ছেলে হবে নাকি মেয়ে? উনি পুলকিত হয়ে বললেন,
— আল্লাহ যেটা দেন, সেটাই আমার জন্য শুকরিয়া। তবে আমার শখ একটা মিষ্টি রাজকন্যার।
— আল্লাহ আপনার মনের ইচ্ছে কবুল করুক।
দেখতে দেখতে ৮টা মাস কেটে গেল। এখন উঠতে বসতে অনেক কষ্ট হয়। উনি সবসময় আমার পাশে থাকেন। সব কাজ করে দেন। আগের থেকে অনেক বেশী যত্ন করেন। চুল বেধে দেন, শাড়ির কুচি ঠিক করে দেন, ওযু করিয়ে দেন। সবসময় আমাকে সময় দেন, কখনোই একা ছাড়তে চাননা। এসব নিয়ে খুব ভালো দিন কাটছিল আমার।কিন্তু ইদানীং আমার খুব অস্বস্তি হয়। মনে হচ্ছে কেউ আমার উপর সারাক্ষণ নজর রাখছে। আশেপাশে খারাপ কিছু উপস্থিতি টের পাই। উনাকে এসব ব্যাপারে কিছু বলিনি যদি অযথা চিন্তা করেন।
আজ সকালে উনি কি একটা কাজে বাহিরে বেরিয়েছেন। আমি নিচে নামতে যাচ্ছি কাজের মেয়ে ৩টাকে ডাকতে। অনেকক্ষণ ধরে রুম থেকে সবাইকে ডাকছি কিন্তু কারো সাড়া পাচ্ছিনা। তাই ওদের খুজতে সিড়ি বেয়ে নিচে নামছি। দুটো কি তিনটা সিড়ি সাবধানে বেয়ে নেমেছি, চিৎকার করে সিড়ি থেকে নিচে পড়ে গেলাম। তারপর কি হয়েছে জানিনা। জ্ঞান ফিরতে দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি। পাশে উনি আমার হাত ধরে বসে আছেন। উনার দিকে তাকিয়ে দেখি চোখ দুটো ফুলে আছে, নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ধরে কেদেছেন। আমি উঠে বসে উনার গালে হাত রেখে বললাম,
— কেদেছেন কেন?
— তুমি সিড়ি থেকে পড়লে কি করে? তোমাকে না বারণ করে গিয়েছিলাম একা একা নিচে নামবেনা।
— আমি তো সাবধানেই নামছিলাম। হঠাৎ মনে হল কেউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল।
— একি তোমার হাতের তাবিজ টা কোথায়?
— গোসল করার সময় খুলে কোথায় যেন রেখেছিলাম এরপর থেকে আর পাচ্ছিনা। তাই তো সাবিনা-সাবিবা, রিতাকে ডাকছিলাম যাতে ওরা আমাকে খুজে দেয়। এটা শুনে উনি পুরো ঘর খুজলেন কিন্তু পেলেননা। পরে এসে উনার তাবিজ টা খুলে আমাকে পরিয়ে দিলেন।
— এটা আপনার তাবিজ আমাকে পরাচ্ছেন কেন? এটা আপনার কাছে রাখুন, আল্লাহ না করুক আপনার যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়।
— আমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি তো হবে যদি তোমার আর আমার সন্তানের কিছু হয়। এটা সাবধানে রেখো।
আজ যদি সাবিনা তোমাকে ছুটে এসে না ধরতো, কি হত ভেবে দেখো।এই কথা শুনে আমারো গা শিউরে উঠল, আসলেই তো আজ বড় কিছু ঘটে যেত।
বিকেলের দিকে বাবা আর ভাই আমাকে দেখতে এলেন। বাবাকে অনেক খুশি দেখেছিলাম আমার সুসংবাদে। কিন্তু আজকের ঘটনা শোনার পর উনার মুখ কালো হয়ে গেল।
— মা তোমাকে আরো বেশি সাবধান হতে হবে। কেউ চায়না তোমাদের সন্তান এই পৃথিবীতে আসুক। তার জন্য সে যা খুশি করতে পারে।
— কে সে বাবা? কে চায়না?
— তোমার মা।
— কি বলছো কি বাবা?
— হুম, তোমার একজন কালোযাদুকরী, শয়তানের পূজাকারিণী । আমি যখন জেনে এসবে বাধা দিয়েছিলাম, তোমার মা প্রচন্ড ক্ষেপে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
— কিন্তু মা কেন আমার এতবড় ক্ষতি চায়?
বাবা কিছু বলার আগে দেখি বাবা আর ভাই শুণ্যে ভেসে উঠছে। এটা দেখে আমি চিৎকার করতে থাকি। একটা অদৃশ্য নারীকন্ঠ আমাকে বলছে, বাবা আর ভাইকে বাচাতে চাইলে তাবিজ ছুড়ে ফেলে দাও।
বাবা আমাকে বারণ করে বলছেন, না মা, আমাদের যাই হোক তুমি তাবিজ খুলবেনা। আমার কসম লাগে মা।
বাবার এই কথা শোনার পর কে যেন বাবা আর ভাইকে আমার চোখের সামনে দুটুকরো করে ছিড়ে ফেলল।
এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে আমি জ্ঞান হারাই।
জ্ঞান ফেরার পর দেখি মুস্তফা নীরবে কাদছে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, ওই শয়তানী আমার বাবা আর ভাইকে মেরে ফেলেছে।
— শান্ত হও মুশায়রা। আমার কাছে কোনো শক্তি নেই এসব মোকাবেলা করার। সব শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি। তাই কোনোঅবস্থাতেই তুমি এই তাবিজ খুলবেনা।
— ও আপনার কোনো ক্ষতি করবেনা তো!
— ভেবোনা আমার কিচ্ছু হবেনা।এসো ঘুমাও।
মাঝরাতে উঠে দেখি মুস্তফা আমার পাশে নেই। দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা, ” নিজের স্বামীকে বাচাতে চাইলে কালো পাহাড়ে চলে এসো।”
পরেরদিন রাতে আমি সেই পাহাড়ের গুহার সামনে আসি। দেখি একজন ভয়ংকর মহিলা আগুনের সামনে বসে বিড়বিড় করছেন। মুস্তফা একটা ছোট বোতলে বন্দি।আমার ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে এই বাজে মহিলাটি আমার মা। আমাকে দেখে বলল,
— তাবিজ খুলে ফেল।
— খুলবনা। কি করবেন আপনি? আমার কথা শুনে মহিলা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাতে একটা পুতুল নিয়ে পুতুলটির বুকের বামদিকে সুচ প্রবেশ করাল। সাথে সাথে মুস্তফা আর্তনাদ করে নিচে লুটিয়ে পড়ল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
— দেখবি কি করে তোর চোখের সামনে তোর স্বামীকে টুকরো টুকরো করি।
— না ওকে কিছু করবেননা।আমি তাবিজ খুলে ফেলছি।
আমি হাত থেকে তাবিজ খুলে ছুড়ে ফেলে দিলাম।
মহিলাটি আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ” তোর স্বামী তো মরে গেছে এখন তোর পালা। মহিলাটি আমার বুকে ধারালো ছুরি বসিয়ে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে পাহাড় থেকে ফেলে দিল।
যত নিচে পড়ে যাচ্ছি আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে
আসছে।
কাপা কাপা কন্ঠে শেষ আর্তনাদ করলাম, “আল্লাহ আপনি এর উত্তম প্রতিদান দিন।”
সমাপ্তি
ধন্যবাদ
কেমন হয়েছে জানাবেন।