#প্রার্থনায় রবে তুমি
#পর্ব ২৮ (শেষ পর্ব)
#Saji Afroz
-তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?
বিশাল সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে হুট করে রুজাইনকে এই প্রশ্নটি করে বসলো ইধা। রুজাইন সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিলো, এই বিশাল সমুদ্রের গভীরতা নিয়ে কোনো সন্দেহ আছে তোমার মনে?
না সূচকভাবে মাথা নাড়ে ইধা। রুজাইন বলল, তবে আমার ভালোবাসাতেও সন্দেহ করো না। সমুদ্রের চেয়েও বেশি গভীর তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা।
রুজাইনের কাঁধে মাথা রেখে ইধা প্রশান্তির শ্বাস নিয়ে বলল, হারাতে চাই না এই ভালোবাসা আমিও।
পাঁচ বছর!
পাঁচটা বছর পার হয়ে গেল ইধা চলে যাওয়ার। কাউকে কিছু না জানিয়ে ভোরেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে ও।
সেদিন মাইশার ফোন পেয়ে ওর কাছে ছুটে আসে রুজাইন। মাইশার কান্নায় পুরো বাড়ি থমকে গিয়েছিল।
ওর ভাষ্যমতে ঘুম থেকে উঠেই ইধাকে দেখতে পায় না। ওর জিনিসও নেই খেয়াল করে আশেপাশে তাকাতে থাকে। টেবিলের উপরে একটি কাগজের দিকে চোখ গিয়ে আটকায় ওর। ইধার হাতের লেখা দেখে চটজলদি হাতে নেয় ওটা। মাইশার নামে লেখা চিঠিটা পড়তে থাকে ও।
প্রিয় “মাইশা”
শুনেছি কাছের মানুষ থেকেই কষ্ট বেশি পায় মানুষ! আমি আজ তোকে সেই কষ্টটা দিতে চলেছি। আমি তোকে না জানিয়ে চলে যাচ্ছি নিজ গন্তব্যে। ফোনেও আমায় পাবি না। আর কখনোই আমায় পাবি না৷ শুধুমাত্র রুজাইন থেকে দূরে থাকতে তোকে ছাড়তেও বাধ্য হলাম। রুজাইন আমার পিছু ছাড়বে না। এদিকে মা কে কষ্ট দিতে পারব না। তাই তার কথায় আমি ফিরে গেলাম তার কাছে। আমাকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা করিস না তোরা। খুঁজে পেলেও তোদের কাছে থাকব আমি অপরিচিত। কারণ আমি আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না তোদের সঙ্গে। আমায় ক্ষমা করিস!
চিঠিটা রুজাইনও পড়ে। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসে ওর। ধপাস করে বসে পড়ে মেঝেতে। ওর অবস্থা দেখে মরিয়ম জান্নাতও বুঝে যান, ইধাকে ভালোবাসতো রুজাইন! তিনি সবটা জেনে অবাক হোন। এতসব কিছু ঘটে গেল আর তিনি কিছু টেরই পেলেন না! ইধা অন্য ধর্মের মেয়ে শুনে আরও বেশি অবাক হলেন তিনি। কিন্তু আজ আর এই বিষয়ে কিছু মাইশাকে বললেন না। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এসব কী আর ধর্ম মেনে হয়! সবার উপরে মানুষ সত্য৷ শিক্ষাগত জীবনে অন্তত এতটুক বোঝার ক্ষমতা তার হয়েছে।
মাইশার অবস্থা দেখে রুজাইন বুঝতে পারলো, ইধা আসলেই ওকে কিছু জানায়নি৷ রুজাইন ইধার কাছে এতটাই বিরক্তিকর যে ওর জন্যে প্রিয় বান্ধবীকেও ঠকালো ও!
ভাবতেই মনের ভেতরে কেমন করে উঠে রুজাইনের। বাসায় এসে মা কে জড়িয়ে ধরে সেও বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা কে বলল ও, সব ছেড়ে দিতে রাজি ছিলাম ইধার জন্য। আর ও এভাবে না বলে চলেই গেল। আমি এতটাই বিরক্তিকর ওর কাছে!
মা এর কোনো শান্তনার বাণী কানে এল না রুজাইনের। ইধার কথা ভাবতে ভাবতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ও।
আগের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রুজাইন। ওর মা কে নিয়ে আজ কক্সবাজারের সমুদ্র দেখতে এসেছে। এতে যদি মনটা একটু ভালো হয়! সবসময় মনমরা হয়ে থাকেন তিনি। কারো সাথে কথা বলেন না। অবশ্য যে ঝড় তার জীবনে এসেছে, এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
সমুদ্র দর্শনের পরে মা কে নিয়ে কল্লোল রেস্টুরেন্টে এল রুজাইন। এখানে এসেও ইধার কথা মনে পড়ে গেল ওর। এখানেই ইধাকে মনের কথা জানিয়েছিল রুজাইন।
কক্সবাজারের প্রতিটা জায়গায় যেন ইধাকে দেখতে পাচ্ছে রুজাইন। কিন্তু আশ্চর্য! এখন ওর শরীরের ঘ্রাণটাও ভেসে আসছে নাকে। মনে হচ্ছে ইধা ওর পাশেই রয়েছে।
রুজাইন ছটফট করতে থাকে। আশেপাশে তাকাতে থাকে ও। হঠাৎ ওর চোখ গিয়ে আঁটকায় একদম শেষ মাথায়। অনেক গুলো বাচ্চার সাথে একটি শাড়ি পরিহিতা মেয়েকে দেখতে পেল ও। তবে মেয়েটি অপর দিকে ফিরে থাকায় চেহারাটা দেখতে পেল না। রুজাইন ওর কাছেই যাবে তখনি ওয়েটার চলে আসে। রুজাইন নিজের জন্য ও মা এর জন্য খাবার অর্ডার দেয়। ওয়েটার চলে যেতেই ওদিকে মনোনিবেশ করে রুজাইন। এখনো ওদিকেই ফিরে আছে মেয়েটি।
রুজাইনের বুক ধুকপুক করে উঠে। কেন যেন মনেহচ্ছে মেয়েটিই ইধা!
মা কে বসতে বলে রুজাইন ওদিকে এগিয়ে যায়। তবে খুব সাবধানে, যেন মেয়েটি কিছু বুঝতে না পারে।
ওদের কাছে এসেই আড়ালে দাঁড়ায় রুজাইন। আর ওর ধারণা মিলে যায়। এই মেয়েটিই ইধা! ওর ইধা। ওকে দেখেই চোখ জোড়া ছলছলে হয়ে উঠে রুজাইনের। পাঁচ বছর আবার ইধাকে এভাবে দেখতে পারবে ভাবেইনি ও!
আগের মতোই রয়ে গেছে মেয়েটা। ভীষণ মায়াবী লাগছে দেখতে ওকে।
নীল রঙের একটি শাড়ি পরেছে। তার উপরে পরেছে সাদা রঙের জ্যাকেট। আর মাথায় রয়েছে সাদা রঙের কানটুপি। ঠিক যেন আগেই সেই ইধা!
ওকে দেখে রুজাইনের হাত পা কাঁপছে। ওর সামনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তখনি একটি বাচ্চা বলে উঠলো, আজ কার জন্মদিন?
ইধা মৃদু হেসে বলল, যে আমার প্রার্থনাতে আছে! তোমাদের দোয়াতেও আজ থেকে তাকে রাখবে। রব যেন তাকে সবসময় ভালো রাখে।
আরেকটি বাচ্চা বলল, দোয়া করার জন্যই আমাদের আশ্রয় কেন্দ্র থেকে নিয়ে এলেন বুঝি?
ইধা একগাল হেসে বলল, তা তো অবশ্যই। তবে সাথে তোমাদের ইয়াম্মি ইয়াম্মি খাবার দেব। আর করব অনেক মজা!
সবাই একসাথে হৈ-হুল্লোর করতে করতে কেকটা কাটে। ইধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবাই বলল, শুভ জন্মদিন রুজাইন!
রুজাইনের আর বুঝতে বাকি রইলো না, ইধা এখনো ওর জন্মদিন আর মনে রেখেছে ওকে! তবে কেন এই লুকোচুরি! কেন! এই প্রশ্নের উত্তর জানতে সামনে এগিয়ে এসে রুজাইন বলল-
আমি তোমারই হওয়ার কথা ছিল, তবে কেবল তোমার প্রার্থনায় কেন আমি?
ইধা চমকে উঠে। পাশ ফিরে রুজাইনকে দেখে অবাক হয়ে ক্ষীণস্বরে বলল, রুজাইন!
-অবাক হচ্ছ? আমিও হয়েছি। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি এসব দেখে। আমার জন্মদিন আমাকে ছাড়াই পালন করছ।
এতদিন পর রুজাইনকে দেখে ইধার চোখে আনন্দে পানি চলে আসে। ও আমতাআমতা করে বলল, এটা সত্যিই তুমি!
-এত অবাক হচ্ছ কেন? ছেড়ে তো আমি যাইনি ইধা। গিয়েছ তুমি। কেন গেলে?
বাচ্চারা ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইধা ওদের দায়িত্বে থাকা মেয়েটিকে ডেকে বলল, ওদের খাওয়া দাওয়ার পর্বটা দেখে নিন। আপনিও খেয়ে নিন। আমি একটু পরে আসছি।
এই বলে রুজাইনকে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে আসে ও। ইধা বলল, দেখো! কোনো সিনক্রিয়েট করো না। আমার হঠাৎ মনে হলো তোমার জন্মদিন। তাই বাচ্চাদের সাথে একটা কেক কাটলাম। এছাড়া আর কিছুই না।
-হঠাৎ মনে হলো? কই! আমার তো তোমার জন্মদিনের কথা মনে হলেও এমন কিছু করি না। ক’দিন বাদে তো তোমারও জন্মদিন। কেক কাটার প্লান তো আমি করিনি৷ কারণ তোমার প্রতি ছিল আমার একরাশ অভিমান!
-আমিও করিনি এতদিন। ওদের সঙ্গে কেক কাটতে একটা উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। তাই আরকি!
-আচ্ছা! বাদ দাও এসব। কেন গেলে সেটা বলো?
-সেটা তুমি জানো।
-আমিও ভাবতাম আমি জানতাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমি জানি না। তুমি আমায় সত্যিটা বলবে।
-ভালো থাকার জন্য গিয়েছিলাম। আজ দেখো! আমি অনেক ভালো আছি।
-ভালো তুমি আছ। আমার স্মৃতি নিয়ে ভালো আছ। তবে আমাকেই কেন রাখলে না! বলো ইধা! বলো!
ইধা ধমকের সুরে বলল, প্লিজ যাও এখান থেকে! ছেড়ে এসেছি পাঁচ বছর হয়ে গেছে। এখন এসব কথার মানেই হয় না।
-কিন্তু আমি তো পাঁচ বছরেও ভুলতে পারিনি তোমায়। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে পার করেছি প্রতিটা বছর। এত ভালোবাসার পরেও তোমার অবহেলা আমি নিতে পারিনি। এখনো অবধি সেই দিনের কথা ভেবে ভেবে কষ্ট দিই নিজেকে। আমার কী সত্যিটা জানারও অধিকার নেই?
ইধা কিছু বলতে যাবে তখনি শারমিন আক্তারের মুখে ওর নাম শুনতে পায়। পেছনে ফিরে তাকে দেখে চমকায় ইধা। ও বলল, আন্টি!
ইধার চেয়েও বেশি অবাক হয় রুজাইন! ও এসে বলল, আম্মু! তুমি কথা বলছ আম্মু!
তিনি খুশি হয়ে বললেন, ইধা এখানে!
-হ্যাঁ আম্মু। ইধা এখানে। কিন্তু আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না তুমি কথা বলতে পারছ!
ইধা কাছে এসে বলল, মানে কী?
-তিন বছর আগে আম্মু কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এই তিন বছরে একটা শব্দও তিনি মুখ থেকে বের করেননি।
এই বলে আনন্দে হাসতে থাকে রুজাইন।
ইধার পাশে এসে এসে শারমিন আক্তার বললেন, সব আমার কর্মের ফল।
ইধা ও রুজাইন দু’জনেই অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে।
তিনি বললেন-
রুজাইনের বাবাকে নিয়ে যা তোমায় বলেছিলাম সব মিথ্যে ছিল ইধা!
ইধা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল, মানে?
-ওর বাবা কিছুই জানতো না। তোমার সঙ্গে যে কথা বলেছে সে ওর বাবা নয়। সবটাই আমার নোংরা প্লান ছিল। কিন্তু এসব করে তোমাদের আলাদা করলেও ঠিকই আমার সংসার ভেঙেছে। ওই মিথ্যা কথা হয়েছে সত্যি। রুজাইনের বাবা আরেকটি বিয়ে করে নিয়েছে। ওই বউকে তার সাথেই রেখেছেন। আমার বানানো কথাটি হয়ে গেছে সত্যি!
ইধা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, কেন করেছেন আপনি এসব? এত বড়ো মিথ্যা কেন বলেছেন?
-উনি সত্যিই রাগী ছিলেন। আমার মনে হত সব জানলে তিনি এমনটাই করতেন। তাই তার কানে যাওয়ার আগে আমি সব মিটমাট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দেখো! আমার মিথ্যাটা সত্যি হয়ে গেল। আমার স্বামী আর একার আমার নেই! আসলেই কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ সুখী হতে পারে না! আমায় তুমি ক্ষমা করে দাও মা! ক্ষমা করে দাও!
এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রুজাইনের মাথা ঘুরছে। সবটা না বুঝলেও এটা বুঝেছে ও, মা এর কথাতেই ইধা এমনটা করেছিল। ও বলল, আমাকে এইবার কী সবটা বলা যায়?
এইবার রুজাইনকে শুরু থেকে সবটা বলল ইধা। সব শুনে রুজাইনের পা এর নিচ থেকে যেন মাটি সরে যায়!
ও মা এর সামনে এসে কর্কশ কণ্ঠে বলল, নিজের জেদের জন্য ছেলের খুশিটা তুমি দেখলে না? এই মেয়েটার কষ্ট তুমি বুঝলে না মা!
-জেদ নয় বাবা! আমি সবার ভালোর জন্য করেছিলাম এসব।
-হয়েছে ভালো? আমি কত কষ্টে ছিলাম, এরপরেও আমায় তুমি কিছু জানাওনি।
-ভেবেছিলাম সময় এর সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।
এরপর তোর বাবার বিয়ের খবরে আমি এতটাই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছি যে, কোনো কিছু ভাবার ক্ষমতা আমার মাঝে ছিল না। আমি এই পৃথিবীতে ছিলাম, কিন্তু প্রাণটা যেন অন্যখানে ছিল!
কিছুই আমার মনে ছিল না। আজ ইধাকে দেখে সবটা মনে পড়লো।
রুজাইন ইধার দিকে তাকিয়ে বলল, আম্মুর অবস্থা আসলেই এমন ছিল৷ ডাক্তার বলেছিলেন বড়ো ধরনের মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। তাই বোধশক্তি হারিয়েছেন। এটা এক ধরনের রোগ। বাবাও একবার দেশে এসেছিলেন। বাবাকে দেখেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। শুধু তাকিয়ে থাকাটাই যেন ছিল তার কাজ। বাসায় তিনটে কাজের বুয়া রেখেছি। আম্মু কোনো কাজ করে না। না করে দেখাশোনা! এমনকি আম্মুর খাবার, ওয়াশরুমে আনা নেওয়া এসবও বুয়ারাই করে। সুস্থ মানুষ। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার মাঝে।
শারমিন আক্তার বললেন, হয়তো ইধার সাথে এই অন্যায় করেছি বলেই আমার অবস্থাটা ওমন হয়েছিল। আমার সেন্স কাজ করলে তখনিই ইধাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা আমি করতাম। তবে আজ আমি আমার করা সকল অন্যায় এর প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই৷ ইধা আমায় ক্ষমা করে দাও৷ প্লিজ মা প্লিজ!
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইধাকে এসব বললেন শারমিন আক্তার। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কষ্ট আপনিও কম পাননি আন্টি। কটু কথা বলে নতুন করে আর কী কষ্ট আপনাকে দেব বলুন? আমি আপনার প্রতি কোনো রাগ রাখব না। নিশ্চিন্তে থাকুন আপনি।
-শুধু ক্ষমা না। আমার আরও কিছু চাই।
-কী?
-তোমাকে।
মা এর দিকে হাস্যজ্বল মুখ নিয়ে তাকালো রুজাইন। ওর মনের কথাটা মা বলে দিলো। এই বুঝি আবার সবটা ঠিক হতে চলেছে!
ইধা ছলছল নয়নে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তিনি পাশে এসে বললেন, আসবে না আমাদের জীবনে?
ইধা নরমস্বরে বলল, এটা সম্ভব না আন্টি।
-অভিমানে বলছ তাই না?
এইবার আমি কোনো শর্ত দেব না। বরং তুমিই শর্ত দাও। যা দেবে আমি মেনে নেব। তবুও প্লিজ না করো না।
ইধা চোখের পানি মুছে বলল, অনেকটা দেরী হয়ে গেছে।
রুজাইন বলল, ফেলে আসা দিন গুলো যাও না ভুলে! এখন মা ও রাজি। আর তোমার মা কিছুই জানতেন না বলেছ। আমরা ঠিকই মানিয়ে নেব।
ইধা বলল, মা হয়তো মানতেন। কিন্তু এখন আর আমিই মানতে পারব না।
রুজাইন হতাশকণ্ঠে বলল, কেন ইধা? এখনো কিসের বাঁধা?
ইধা ওর মাথায় থাকা টুপিটা খুললো। সাথে খুললো পরণে থাকা জ্যাকেট। ইধার মাথায় সিঁদুর আর হাতে শাখা দেখে ওরা বুঝতে পারলো, ও এখন বিবাহিতা!
যা দেখে রুজাইনের আশার আলোটা নিভে গেল নিমিষেই। ও কাঁপাকণ্ঠে বলল, বিয়ে করেছ?
ইধা বলল-
ওখান থেকে ফিরে এসে মা কে নিয়েই দিন পার করছিলাম। একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে অপরটাই আমরা থাকতাম। ক’টা টিউশনি করতাম। এভাবেই খরচা মিটাতাম। ওখান থেকে ফেরার বছর খানেক পরেই মা এর একটা অপারেশন করানোর প্রয়োজন পড়ে৷ আমাদের ওত টাকা ছিল না যে মা কে অপারেশন করাব। ডাক্তারের কাছে নিলেও অপারেশনের ব্যবস্থা আমি করতে পারছিলাম না। আমার কান্নাকাটি দেখে এগিয়ে আসে একজন। ওখানেরই সদ্য ডাক্তার অনীল। সে ফান্ড নিয়ে এর সহায়তা দিয়ে অপারেশন করতে সাহায্য করে। এরপর মা এর সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়। আর তখন থেকেই আমাকে নাকি তার পছন্দ হয়। একথা অবশ্য আরও বছর খানেক পরে জানায়। কিন্তু আমি তার ডাকে সাড়া দিতে পারিনি। কারণ টাও মা কে না বললেও তাকে বলেছিলাম। সব জেনেও সে আমাকে খুব করে চাইতো। এবং অপেক্ষা করবে বলেছে আমার জন্যে। অবশেষে মা এর কথা রাখতে আমি বিয়েতে রাজি হই। আর জানো? দু’দিন আগেই আমাদের বিয়েটা হয়েছে। আমরা এখানে এসেছি হানিমুনে। অবশ্য আমি কক্সবাজার আসতেই চাইনি। তোমার স্মৃতি তাড়া করবে আমায় এই ভেবে। এখানে তার একটা ক্যাম্পের কাজও আছে। তাই জোর করে নিয়ে আসলো।
সবটা শুনে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন শারমিন আক্তার। তিনি বললেন, আমার জন্যই সব হয়েছে! কেন আমি ওত স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম!
ইধা বলল, নিয়তি হয়তো এটাই চাইতো আন্টি। তাই আপনাদের সাথে দেখা হওয়ার আগেই বিয়েটা হয়ে গেল আমার!
রুজাইনের চোখও ছলছলে। ইধার জ্যাকেট ও টুপির কারণে এতক্ষণ শাখা-সিঁদুর চোখেই পড়েনি ওর। না জেনে অন্যের স্ত্রীকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল। যা মোটেও উচিত নয়।
অনীল নিশ্চয় ইধাকে ভীষণ ভালোবাসে। তাইতো চারটে বছর আগলে রেখে নিজের করে নিয়েছে ওকে। আর কোনো কথা বলে ইধাকে কোনো দ্বিধাতে ও ফেলতে চায় না। রুজাইন নিজেকে শক্ত করে বলল, কোথায় তোমার হাসবেন্ড?
-ক্যাম্পের কাজ শেষ করেই আসবে। তোমরা বসো না!
-আমারও কিছু কাজ আছে। আজ আসি।
রুজাইনকে থামিয়ে ইধা বলল, আমাকে মাইশার ফোন নাম্বারটা দেবে?
-কেন নয়!
মাইশার নাম্বার নিয়ে নেয় ইধা। এরপর রুজাইনের দিকে তাকিয়ে ও বলল, তুমি ভালো থাকার জন্যই ভালোবাসা সেক্রিফাইস করে চলে এসেছিলাম। এভাবে ছন্নছাড়া হয়ে থেকো না।
রুজাইন মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে বলল, ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু এখন আবার জম্মেছে। তুমি তো আমায় ঠকাওনি। বরং আমায় ভালোবেসে আমার ভালোটা চেয়েছিলে। আর এই ভালোবাসার বিশ্বাস নিয়েই আমিও নিজের জীবনকে আর ছন্নছাড়া থাকতে দেব না।
ইধা হাসিমুখে বলল, আমিও এটাই চাই।
-আসি তাহলে?
হ্যাঁ সূচকভাবে মাথাটা নাড়ে ইধা। রুজাইন মা কে নিয়ে বেরুচ্ছে রেস্টুরেন্ট থেকে। ওর মনে চলছে ভয়াবহ তুফান। পেয়ে হারানোর কষ্টের চেয়ে না পাওয়ার কষ্টটাই যেন ভালো ছিল!
আজ অনেকটা হালকা লাগছে ইধার মন। রুজাইনও নিজেকে গুছিয়ে নেবে ভেবে শান্তি পাচ্ছে ও। তবুও হৃদয়ের গহীনে একটা আফসোস থেকেই গেল৷ রুজাইনকে নিজের করে না পাওয়ার আফসোস!
ইধা নিজের ফোন থেকে মাইশার নাম্বারে ডায়াল করে। একবার রিং হতেই রিসিভ করা হয়। ওপাশ থেকে ছোটো বাচ্চার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে কানে। ইধা বলল, কে তুমি?
বাচ্চাটি আধো ভাষায় কী যে বলছে ইধা বুঝতেই পারছে না। তবে এইবার মাইশার কণ্ঠস্বর শুনতে পায় ও। ফোন রিসিভ করায় বাচ্চাকে বকে ও হাতে নিয়ে নেয়। এরপর বলল, আসসালামু আলাইকুম। কিছু মনে করবেন না। হাতে চাপ পড়ে বাচ্চা রিসিভ করে ফেললো। কে বলছেন?
-ইধা।
ওর নাম শুনে বিস্ময় এর শেষ পর্যায়ে চলে আসে মাইশা। ও কাঁপা কণ্ঠে বলল, তুই?
-আমি কী খালামনি হয়ে গেলাম?
-আরও দু’বছর আগেই৷ আমার এত ভালো একটা সময়ে তোকে পাশে পাইনি। কত খুঁজেছি তোকে! এভাবে ছেড়ে যেতে পারলি?
-নিরূপায় ছিলাম।
-তবে এখন ফিরে এলি কেন? এলিই যখন আরও আগে এলি না কেন! কত কষ্টে ছিলাম আমি!
-হয়তো আজও আসা হত না। কিন্তু আজ আর কোনো বাঁধা নেই।
-মানে?
অনীলকে এগিয়ে আসতে দেখে ইধা বলল, আমি তোকে পরে ফোনকল দেব। অনেক কথা জমে আছে রে! এখন রাখছি।
-হারিয়ে যাবি না তো আবার?
-তোর কাছ থেকে আর কখনোই হারাব না! কখনোই না।
অনীল এসে বলল, দেরী করে ফেললাম তাই না?
ইধাকে নিজেকে সামলে সব মাথা থেকে ঝেড়ে বলল, তেমন একটা না। কাজ হলো আপনার?
-হয়েছে। কাল ক্যাম্পে তুমিও যাবে। দেখবে সব। তোমারও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। কেননা আমার ফিউচার সাইকিয়াট্রিস্ট তুমি।
ইধা হাসে। অনীল বলল, খিদে পেয়েছে ভীষণ। চলো খাই?
অনীল এগুলে ওকে থামিয়ে ইধা ওরটা হাতটা ধরলো৷ এই প্রথম ইধা নিজ থেকে এমনটা করেছে দেখে অনীলের মুখেও হাসি ফোটে। সেও ইধার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। মেয়েটা সব ভুলে ওর সঙ্গে সুখে থাকুক, এটাই তো চায় অনীল!
ওরা বাচ্চাদের পাশে আসে। সবার সঙ্গে খেতে বসে। গল্পগুজবে কাটাতে থাকে সময়। খাওয়ার পর বাচ্চাদের দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনি এসে অনীলের হাতে একটি প্লেট দিয়ে বললেন-
আপনার জন্য রাখা হয়েছে কেক।
-আচ্ছা তাই! ধন্যবাদ।
কেকের টুকরোটির দিকে চোখ পড়তেই অনীল দেখলো, তাতে লেখা আছে-
রুজাইন
ইধা বলেছিল আজ তার জীবনের স্পেশাল কারও জন্মদিন। অনীল নাম জিজ্ঞাসা করেনি। তবে ধারণা করেছিল। ধারণা মিলেছে দেখে মৃদু হাসলো ও।
মেয়েটার প্রার্থনাই বুঝি আজীবন রয়ে যাবে রুজাইন! তবে অনীলের এই নিয়ে কোনো দু:খ নেই। ভালোবাসার মানুষটা জীবনে নাই থাকতে পারে, তাকে প্রার্থনায় রাখতে তো কারো পারমিশনের প্রয়োজন নেই!
ইধা ওর সঙ্গে স্বাভাবিক হতে চাচ্ছে এটাই অনেক। এই ভেবে ইধার দিকে তাকায় অনীল। ইধাও তাকায় ওর দিকে। ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় কী হয়েছে জানতে চায়। অনীল হেসে ইশারায় জবাব দেয়, সুন্দর লাগছে তোমাকে।
ইধা ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, আপনাকেও।
অনীল ওর পাশে এগিয়ে আসে। জ্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, পরে নাও। ঠান্ডা লাগবে।
ইধা ওর কথা মতো জ্যাকেট পরে নেয়। আর আপনমনে ভাবে, এই মানুষটা আমাকে অনেক ভালোবাসে। আজ থেকে আমিও নাহয় তাকে একটু খুশি রাখার চেষ্টা করব!
হোটেল রুমে ফিরে আসে রুজাইন। এই পাঁচ বছর ইধাকে ভুল বুঝে এসেছিল ও। আজ সব সত্যিটা জেনে মনটা অনেক হালকা হলো। তবে ওকে না পাওয়ার আফসোস রুজাইন বয়ে বেড়াবে আজীবন। ইধাকে বলেছে জীবন গুছিয়ে নেবে। কিন্তু আদৌ কী রুজাইন পারবে! নাকি ওর স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দেবে বাকিটা জীবন! হায়! নিজের জীবন নিয়েই সন্দিহান রুজাইন। কেন ইধাকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছিল ও!
.
সমাপ্ত