#মৃত_কাঠগোলাপ-৬,৭
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
ধ্রুবর হাতে একটি আধখাওয়া সিগারেট। ধ্রুব সিগারেটের ডগা মুখে পুড়ে নিয়ে সুখী সুখী ধোঁয়া ছাড়ছে। তার সামনে সোফা সংলগ্ন টেবিলের উপর পড়ে আছে মৃদুল ও আয়েশীর বিয়ের কার্ড। একটু আগে মৃদুল নিজে এসে দিয়ে গেছে। ধ্রুবকে বারবার করে বলে গেছে বিয়েতে আসার জন্যে। ধ্রুব না এলে নাকি মৃদুল বিয়ের পিঁড়িতেই বসবে না। ধ্রুবর জন্যেই তো সে আয়েশীকে বিয়ে করতে পারছে। তাই মৃদুল ধ্রুবকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুললো না। মধ্যবিত্ত লোকেদের এই এক সমস্যা। তারা নিজেদের আত্মসম্মানবোধের রাজা মনে করে। যে তাকে এক টাকা দিয়ে বিপদে সাহায্য করে, মধ্যবিত্তরা তার জন্যে প্রাণ দিতেও কুণ্ঠিত হয়না। বড্ড বোকা তারা। পৃথিবীতে এমন ভালো মানুষের দাম কোথায়? তাই তো তারা সবার কাছে লাঞ্ছিত হয়ে থেকে যায়। মাথা তুলে দাঁড়াবার বোধটুকু অব্দি পায়না।
ধ্রুব সিগারেট মুখে পুড়ে আড়চোখে মৃদুলের বিয়ের কার্ডের দিকে চেয়ে থাকলো। কিছু একটা চিন্তা করছে মনে হলো। ওসমান ধ্রুবর পাশে দাড়িয়ে রইলো! আয়েশী বিয়ে করছে অথচ ধ্রুব এখনো নির্বিকার হয়ে বসে রয়েছে। বলা হয়, ঝড় আসার আগে পরিবেশ নাকি বরফের ন্যায় শীতল হয়ে যায়। তারপর..এক ধ্বংসাত্মক ঝড়ে লন্ডভন্ড করে দেয় সেই পরিবেশ। ধ্রুব, সে তো এক আপাদমস্তক ঝড়ের নাম। যার এক থাবা-ই যথেষ্ট চারপাশ ধ্বংস করে দিতে। তাহলে কি ধ্রুবর এক নিশ্চুপতা কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস। ওসমান ভয়ে কেঁপে উঠল। ধ্রুব পায়ের উপর পা তুলে বসল। হাতের সিগারেট অ্যাশ ট্রে তে ফেলে পিষে ফেলল। নতুন আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে ওসমানের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ কি ব্যাপার, ওসমান? তোমার পা কাঁপছে কেন? ভয় পাচ্ছো নাকি? ভয় পেও না। তুমি হলে আমার পাপ সম্রাজ্যের ডান হাত। যতক্ষন না তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছ, তোমায় আমি মারবো না। এতটাও অকৃতজ্ঞ না আমি। হা হা হা। ‘
ধ্রুব গা দুলিয়ে হাসল। হাসিমাখা মুখে কি যে সুন্দর লাগলো তাকে!
ধ্রুব ভীষন সুন্দর মুখের এক তরুণ। ঈষৎ হলদেটে মুখখানি, সরু দু নয়ন, তামাটে বলিষ্ট দেহ! সবমিলিয়ে এক অতীব সুদর্শন পুরুষ। তার হাসিখানা যেন সমুদ্রের ন্যায় শীতল অথচ গভীর। সে হাসলে, তার থুতনিতে ছোট্ট একটা গর্ত পড়ে। ভীষন সুন্দর লাগে তখন! ওসমান মাঝেমধ্যে ভাবে, ধ্রুব যদি মেয়ে হত তবে তার পেছনে ছেলের অভাব হতো না।
কিন্তু যেমন সুন্দর তার বাহ্যিক দেহ, ঠিক তেমন-ই কুৎসিত তার মনের ভেতর। যে একবার ধ্রুবর ফাঁদে পা দেয়, সে-ই ফেঁসে যায়।
ধ্রুব হাত বাড়িয়ে বিয়ের কার্ড নিল। কার্ডটি খুলে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে চোখ বুলালো লাল-হলুদ কারুকাজ করা বিয়ের কার্ডটিতে। ধ্রুব কার্ডে চোখ রেখে বলল,
‘ তোমার ভাবিকে কখনো দেখেছ, ওসমান? ‘
ওসমান বুঝল, ধ্রুব আয়েশীর কথা বলছে। ওসমান মাথা নাড়ালো। বললো,
‘ দেখেছি, স্যার। ‘
ধ্রুবর নজর কঠিন হয়ে এল। কার্ড থেকে চোখ সরিয়ে ওসমানের দিকে চেয়ে বলল,
‘ একবার দেখেছ, তাই মাফ করে দিলাম। পরবর্তীতে তার দিকে চোখ তুলে তাকাবে না, ওসমান। নাহলে তোমার সেই দুঃসাহসী চোখ আমি ছুরি দিয়ে উপড়ে দেবো। ‘
ভয় পেয়ে ওসমান তাৎক্ষণিক নিজের চোখে হাত দিল। এই বয়সে আর অন্ধ হওয়ার শখ নেই তার। ওসমান মাথা নত করল। বলল,
‘ দুঃখিত, আর হবে না স্যার। ‘
‘ গুড। ‘
ধ্রুব কার্ড আবার টেবিলে রেখে দিল। ওসমানের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল,
‘ বিয়েটা যেন কবে, ওসমান? ‘
‘ স্যার, এ মাসের দুই তারিখ। ‘
ধ্রুব কেমন করে যেন হাসল। ওসমানের মনে হলো, এ হাসি কোনো সাধারণ কোনো হাসি নয়। ধ্রুব আরো একটা সিগারেট ধরালো। দু আঙুলের মাথায় একসাথে দুই সিগারেট মুখে পুড়ে নাক মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লো। সিগারেটের ধোঁয়ায় সম্পূর্ণ কক্ষ ধূসর রঙে ছেয়ে গেল। ধ্রুব বলল,
‘ তৈরি হও, ওসমান। এ মাসের দুই তারিখ আমার ঘরে এক টুকটুকে বউ আসবে। আমার রক্তজবা আসবে। তৈরি হও। অভিশপ্ত বাড়ি পুনরায় ফুল দিয়ে সাজিয়ে তুলো। সকল পাপ মোচন করো। সে আসছে। আমার রক্তজবা আসছে। হা হা হা! ‘
ধ্রুব পাগলের মত হাসছে। তার হাসির শব্দে ওসমানের গায়ের লোম সোজা হয়ে যাচ্ছে। কি বিদঘুটে হাসি! ওসমান হতবম্ব চোখে চেয়ে রইলো ধ্রুবর দিকে।
__________________________
আজ আয়েশীর হলুদ সন্ধ্যা! সকাল থেকেই ঘরের মেয়েরা ব্যস্ত কাজ কর্মে। পুরুষেরা ব্যস্ত বাজার করতে। বাড়ীর সবচেয়ে আদুরে মেয়ের হলুদ বলে কথা! আয়েশীর বাবা কামরুল হাসান মেয়ের বিয়েতে এতটুকু ত্রুটি রাখতে চান না। মহা ধুমধামে মেয়ের বিয়ে হবে! মেয়ে আলতা রাঙা পায়ে পা রাখবে তার শ্বশুরবাড়িতে। গা ভর্তি গয়না থাকবে, পরনে ভারী জামদানি শাড়ি থাকবে, হাত পা রাঙানো থাকবে মেহেদীর লাল রঙে। মেয়ে তাদের রাজরানী হয়ে বাড়ি ছাড়বে। কামরুল হাসান একবার এদিক যাচ্ছেন, আরেকবার ওদিক যাচ্ছেন। কাজের শেষ নেই তার। কাজের চাপে কখন যে প্রেশার কমে গেল বুঝতেই পারলেন না তিনি। ফুলের ঢালা নিয়ে মেয়ের কক্ষের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠল। সঙ্গেসঙ্গে তিনি হাত দিয়ে চেপে ধরলেন পাশে থাকা পিলারটি। এত এত কাজের চাপে আজকে প্রেশারের ঔষুধ খাওয়া হয়নি। কামরুল হাসান সময় দিলেন নিজেকে। মাথাটা ঠিক হতেই পিলার ছেড়ে সামনে এগুতে চাইলেন। কিন্তু আবার চক্কর দিয়ে উঠলো মাথা। কামরুল হাসানের হাত থেকে ঢালা পড়ে গেল। মাথা ঘুরিয়ে মাটিতে পড়ে যেতে গেলে, হঠাৎ কোথা হতে আয়েশীর মা মনোয়ারা বেগম হন্তদন্ত হয়ে ধরে ফেললেন স্বামীকে। কামরুল হাসান স্ত্রীর গায়ে ঢলে পড়ে জ্ঞান হারালেন। মনোয়ারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। হাকঢাক করে ডেকে আনলেন কিছু মানুষকে। অতঃপর কামরুল হাসানকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো তার ঘরে।
বিছানায় শোয়ানোর কয়েক মুহূর্ত পর জ্ঞান এল কামরুলের। তিনি চোখ খুলে তাকালেন। আশপাশ পরখ করে ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন,
‘ আমার মা-টা কোথায়, মনোয়ারা? ‘
মনোয়ারা স্বামীর পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। স্বামীর প্রশ্ন শুনে তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন,
‘ আয়েশী সাজছে। ওই পার্লারের মেয়েগুলো এলো না? ওদের কাছেই আছে। ডেকে আনবো? ‘
কামরুল মানা করলেন। বললেন,
‘ না, না। থাক, সাজুক। আজ কত বিশেষ দিন আমার মা-টার। এই দিনে তার মন খারাপ করতে নেই। থাকুক! ডেকে এনো না। আমি ঠিক আছি। ‘
মনোয়ারা ঔষুধের বাক্স বের করলেন। প্রেশারের ঔষুধ বের করে স্বামীর দিয়ে এগিয়ে বললেন,
‘ তুমি আজও প্রেসারের ঔষুধ খাও নি, না? কতবার বলব, নিজের খেয়াল রাখতে শেখো। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হবে? কোথায় যাবো আমরা? সে নিয়ে কখনো ভেবেছো? নিজের মর্জি আর কত? ‘
মনোয়ারা কথা বলতে বলতে কেঁদে উঠলেন। কামরুল স্ত্রীর চোখ মুছে বললেন,
‘ আহা, কাঁদো কেন? আমি ঠিক আছি। দাও, ঔষধটা দাও। অনেক কাজ পড়ে আছে। ‘
মনোয়ারা পানির গ্লাসসহ ঔষধ স্বামীর হাতে দিলেন। কামরুল ঔষধ খেয়ে বিছানা থেকে উঠে যেতে চাইলে মনোয়ারা বাঁধা দেন। জোরপূর্বক স্বামীকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলেন,
‘ কোনো কাজ না এখন। শুয়ে থাকো তুমি। কাজ করে করেই শরীরের আজ এই অবস্থা। তুমি ঘুমাও, আমি সব দেখে নেবো। সাবধান, বিছানা ছেড়ে উঠবে না। বুঝেছ? ‘
স্ত্রীর কথা শুনে কামরুল চুপটি করে মিশে রইলেন বিছানায়। মনোয়ারা কক্ষের বাতি নিভিয়ে চলে গেলেন কাজে। স্ত্রী চলে যেতেই কামরুল হাসান বিছানা ছেড়ে উঠে গেলেন। এখন ঘুমালে কি চলে? বিয়ে বাড়ীতে কত কাজ। মনোয়ারা একা কতদিক সামলাবে?
মনোয়ারা রান্নার দিকটা দেখছিলেন। খানিক পর রান্নাঘর থেকে চোখ গেল ড্রয়িং রুমের দিকে। কামরুল হাসান বাইরে থেকে এসেছেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। এসে হাক ডাকছেন,
‘ আয়েশীর মা, ও আয়েশীর মা! মিষ্টিগুলো কোথায় রাখব?’
মনোয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মানুষটা যে কবে বুঝতে শিখবে!
#চলবে
#মৃত_কাঠগোলাপ-৭
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
হলুদের অনুষ্ঠান যখন শেষ হলো, তখন প্রায় সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আযানে আয়েশীদের গলি মুখরিত। আযান শুনে মনোয়ারা বাড়ীর ছেলেদের সবাইকে মসজিদে পাঠিয়ে দিলেন। মেয়েদের ঘরে নামাজের জায়গা করে দিয়ে আয়েশীকে আসন ছেড়ে তুলে গোসলখানা অব্দি এগিয়ে দিলেন। আয়েশীর সারা গা ভর্তি কাঁচা হলুদ। গা থেকে হলুদের গন্ধ বেরুচ্ছে। আয়েশী মায়ের দিকে চেয়ে আহ্লাদী হয়ে উঠল। আর মাত্র কটা দিন। তারপরই আপন মানুষদের ছেড়ে চলে যেতে হবে একঝাঁক অচেনা মানুষের ভিড়ে। বউ থেকে ভাবী হবে, ভাবী থেকে মামী, মামী থেকে আরো নাম না জানা সহস্র সম্পর্কের ভিড়ে আয়েশী হয়তো নিজেকে ভুলে বসবে। কিন্তু এই যে এত এত সম্পর্ক, এসবে কি মায়ের আঁচলের গন্ধের ন্যায় স্বস্থি আছে? আছে বাবার সেই আদুরে ‘মা’ ডাকের ন্যায় বিশুদ্ধ সম্বোধন? কিছুই নেই! শুধু আছে গুটিকয়েক না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। জীবন যত এগুবে, দায়িত্বের এ কাঁটাতারে আয়েশী ক্রমশ পেঁচিয়ে যাবে। কি আর করার। এই পৃথিবীটাই যে স্বার্থপর! এই পৃথিবীর বিশাল গোল অংশ জুড়ে-ই আছে শুধু দায়িত্ত্ব আর দায়িত্ত্ব!
আয়েশী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। মৃদুল কল দিয়েছে। প্রেমিকের ডাক শুনে আয়েশীর ঠোঁট হেসে উঠল। ফোন ধরে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে মৃদুল বলল,
‘ ক্লান্ত নাকি? ‘
আয়েশী লম্বা এক হাই তুললো। ভীষন ঘুম পাচ্ছে তার। আয়েশী সত্যিই ক্লান্ত। গায়ের প্রতিটা অঙ্গ বোধহয় ভেঙে-চুরে একাকার হয়ে যেতে চাইছে। সারা গায়ে কি এক অসহ্য ব্যথা! আজ সারাদিন বিছানার চোখ দেখে নি সে।
আয়েশী মলিন হাসল। ক্লান্ত গা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে বলল,
‘ কেমন করে বুঝলি? ‘
মৃদুল হাসল। প্রিয় মানুষের হাসির শব্দে আয়েশীর প্রাণ বোধহয় লুটিয়েই পড়ল। ইশ, এত সুন্দর করে হাসে কেন সে? এই যে আয়েশী তার হাসিতে বারবার খুন হয়ে যায়, সে কি তা বুঝে না? আয়েশী মন্ত্র মুগ্ধের নিয়ে শুনে গেল মৃদুলের হাসি। মৃদুল বলল,
‘ কিভাবে জানলাম, সে কথা নাই বা বলি? ‘
আয়েশী বলল,
‘ তুই খুব মেপে মেপে নিয়ে কথা বলিস রে। কথা সবসময় মন খুলে বলতে হয়। কথা বলার সময় কৃপণতা করতে নেই।’
‘ ও, তাই নাকি? ‘
‘ হ্যাঁ, তাই। ‘
‘ যা, মেনে নিলাম। আচ্ছা শোন, ক্লান্ত হলে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নে। আর একটা গ্লুকোজ স্যালাইন খেয়ে নিস। তাহলে শরীরের দুর্বল ভাবটা চলে যাবে। ‘
আয়েশী হেসে প্রশ্ন করল,
‘ এত খেয়াল রাখিস কেন? আমার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ‘
‘ খারাপ হলে হোক। আমি তো আছি, এই খারাপ মেয়েটাকে সামলে নিতে! কি? আছি না? ‘
আয়েশী মুচকি হাসল। উত্তর দিলো না। মৃদুল অবশ্য উত্তরের অপেক্ষাও করল না। সে জানে, আয়েশীর উত্তর কি? প্রেমিকার মন পড়া মৃদুলের জন্যে খুব একটা কঠিন বিষয় না। সহজ বৈকি।
রাত নয়টা বেজে গেছে। কাল সকালে বিয়ে। আয়েশীর এখন ঘুমের প্রয়োজন! মৃদুল বললো,
‘ আচ্ছা, রাখছি। তুই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। বেশি রাত জাগিস না। শরীর খারাপ করবে। ‘
মৃদুল ফোন রেখে দেবে শুনেই, আয়েশীর মন হুট করে খারাপ হয়ে গেল। আজ সকাল থেকে আয়েশীর মনটা ভালো নেই। হুট করে মৃদুলকে হারিয়ে ফেলার ভয় তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ইদানিং মনটা সারাক্ষণ ব্যাকুল হয়ে থাকে। মনে হয়, এই বুঝি মৃদুল হাওয়ার ন্যায় মিলিয়ে গেল। এই বুঝি আয়েশী নিঃশেষ হয়ে গেল! এই বুঝি মৃদুলকে ছুঁতে না পেরে আয়েশীর মরন হলো!
কিন্তু, এমন কেন মনে হচ্ছে? কোনো ধ্বংসাত্মক ঝড় আসবে কি? আয়েশীকে চুপ থাকতে দেখে মৃদুল নরম গলায় ডেকে উঠল,
‘ আয়েশী? ‘
আয়েশীর ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। হুট করে তার কান্না আসছে। আকাশ বাতাস মিথ্যে করে ফেলার মত তীব্র এক কান্না হৃদয়টাকে ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলছে। আয়েশী কান্না আটকালো না। প্রিয়তমার ডুকরে কেঁদে উঠার শব্দে মৃদুল শশব্যস্ত হয়ে পড়ল। বললো,
‘ এই আয়েশী? কি হয়েছে? কাদছিস কেন? ‘
কান্নায় আয়েশীর মুখ চোখ ফুলে গেছে। আয়েশী কাদতে কাদতে বলল,
‘ আমি তোকে খুব ভালোবাসি মৃদুল। এতটা ভালো বোধহয় আমি আর কাউকে এখনও বেসে উঠতে পারিনি। ”
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আয়েশী মৃদুলকে ভালোবাসি বলেছে। নাহলে শত অভিযোগ শুনালেও আয়েশীর মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা বের করা যায়না। এই ছোট্ট একটা শব্দ বলতে লজ্জায় মেয়েটা কেমন যেন গুটিয়ে যায়। মুখ তুলে তাকাবার বোধটুকু পায়না। তবে আজ কোনো কসরত ছাড়া প্রিয়তমার কণ্ঠে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত শব্দটা শুনতে পেয়ে জীবনকে বিধাতার দেওয়া শ্রেষ্ট উপহার বলে মনে হলো মৃদুলের। মৃদুল তৃপ্তির হাসি হেসে বলল,
‘ আমি জানি সেটা। ‘
আয়েশী পুনরায় নাক টেনে বলল,
‘ কাল আমি তোর জন্যে বিয়ের শাড়ি পড়ে অপেক্ষা করব। তুই আসবি তো মৃদুল? ‘
আয়েশীর কণ্ঠে কাতরতা, অদ্ভুদ অস্থিরতা। প্রিয় মানুষকে ঘিরে হাজারো ব্যাকুলতা! প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেলার মত বিশ্রী এক ব্যথা তার ছোট্ট হৃদয়কে ঘুন পোকার ন্যায় কুটকুট করে খেয়ে ফেলছে। আয়েশীর কাতর কন্ঠের বুলি শুনে মৃদুল কিছুটা অবাক হলো বটে। পরক্ষণেই আয়েশীকে শান্ত করতে বললো,
‘ আমি আসবো। যত বাঁধা আসুক না কেন, আমি তোকেই কবুল বলে আমার বাম পাঁজরের হাড় বানাবো। কথা দিলাম। ‘
_________________________________
‘ বর পক্ষের গাড়ি কাল মোহাম্মদপুর রোডের দিকে যাবে। তৈরি থাকবে। যদি কোনো গন্ডগোল হয় তবে জানো তো, তোমাদের কি হাল হবে? প্রাণ নিয়ে আর বাড়ি ফেরা লাগবে না। বুঝেছ? ‘
ধ্রুবর কথা শুনে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল দুজন বিশাল দেহি কৃষ্ণবর্ণের পুরুষ। ধ্রুবর ঠোঁটে হিংস্র হাস! চোখদুটি নিংড়ে যেন আগুন ঝড়ছে। যেকোন মুহূর্ত সেই আগুনে ভস্ম করে দেবে ভুবন। এমন ভয়ঙ্কর ধ্রুবকে আগে কেউ কখনো দেখেনি। এ যেন এক নতুন ধ্রুব! যার শিরা উপশিরা বেয়ে প্রবাহিত হচ্ছে হিংস্রতার কালো র-ক্ত! যে ভালোবাসার মোহে পড়ে ভুলে গেছে সকল মানবিকতা, বন্ধুত্ব, দয়া-মমতা! ধ্রুবের কাছে ভালোবাসা, কি ভীষন হিংস্র অনুভূতির নাম!
#চলবে