#মোহঘোর
#পর্বঃ১৫,১৬
লেখনীতেঃতাজরিয়ান খান তানভি
১৫
স্নিগ্ধ প্রভাতের মিহি, মিষ্টি, পেলব রোদের খেলা চলছে রেহাংশীর চোখে মুখে। খানিক তাপ অনুভূত হতেই নড়ে উঠে সে। রোদের সারথি ফিনফিনে বায়ুতে তার মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা কেশ ক্রমশ দুলে যাচ্ছে নিজস্ব ভঙ্গিতে। আধো জাগ্রত রেহাংশীর কর্ণকুহর হলো মৃদু শব্দ। অলস ভঙ্গিতে চোখ মেলে তাকাল। চোখের কোটরে হানা দিলো এক পশলা রোদ। রেহাংশীর শোয়ার ভঙ্গি বদলাল। ইনজাদের দিকে কাত হয়ে শুতেই দেখল উপুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সে। রেহাংশী অলস হাসে। ঘুমো ঘুমো চোখ প্রস্ফুটিত করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। দরজা থেকে পূণরায় সেই ক্ষীণ শব্দ। রেহাংশী ধীরে উঠে বসে। অগোছালো শাড়ি ঠিক করে নরম সুরে ডাকল—
“শুনছেন! এই যে, শুনছেন!”
রেহাংশীর আদুরে গলার স্বর পৌঁছাল না ইনজাদে গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন মস্তিষ্কে। চুলগুলো হাত খোঁপা করে অলসতা ছাড়িয়ে এগিয়ে আসে ইনজাদের শায়িত দেহের কাছে। জড়িভূত নজরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পেলব গলায় ফের ডাকে—
“শুনছেন! আপনাকে ডাকছে!”
ইনজাদ নড়ল না। সেভাবেই পড়ে রইল। রেহাংশী কাঁপা কাঁপা হাত ইনজাদের পিষ্ঠদেশের পাটাতনে রাখে। উষ্ণ ছোঁয়ায় চমকে উঠে সে। হাত নামিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকে। মেহমাদ আবারও দরজায় শব্দ করল। খুবই আহ্লাদের সাথে। অন্যসময় হলে হয়তো দরজা ভেঙ্গেই ঢুকে যেত। কিন্তু এখন পরিবেশ অন্য।
রেহাংশী তটস্থ হয়। জড়তা আর সংকোচ পানিতে ডুবিয়ে ইনজাদের পিঠে হাত রেখে কিঞ্চিৎ ধাক্কা মেরে বলল—
“এই যে শুনছেন! উঠুন না। আপনাকে ডাকছে।”
ইনজাদের ঘুম ছুটল। ঘুমে নিভুনিভু চোখ দুটো আমিলীত করে ঘাড় ঘুরাল। জড়ো গলায় বলল—
“কী হয়েছে? ঘুমাও তো প্লিজ।”
“আপনাকে ডাকছে। শুনতে পারছেন না?”
বিরক্তি ঝুলে চোখের তারায়। নাক কুঁচকায় ইনজাদ। দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে। চোখ কচলে তাকায় রেহাংশীর দিকে। মেহমাদ আবারও শব্দ করল। ইনজাদ দরজার দিকে তাকাল। ঝুঁকে গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে মোবাইল ফোন নিল। সাইড বাটনে চাপ দিতেই স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ভোর ছয়টা! খিস্তি মেরে উঠে ইনজাদ। এত সকালে ডাকার কী হলো!
দরজা খুলে বাইরে আসে সে। এক চোখে হাত। হামি তুলে যাচ্ছে সমানতালে। কিন্তু মেহমাদকে দেখে উবে গেল ঘুম। ব্যগ্রতা নিয়ে বলল—
“কীরে, এই ভোরবেলা সাহেববাবু সেজে কোথায় যাচ্ছিস?”
মেহমাদ সরল গলায় বলল—
“বাড়ি যাচ্ছি। আম্মা ফোন করে বলল, আব্বার শরীর খারাপ করেছে।”
ইনজাদ ত্রস্তে বলল—
“বলিস কি!”
“হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি। সাবধানে থাকিস।”
“আচ্ছা, পৌঁছে আমাকে ফোন করিস।”
“হুম।”
মেহমাদ যেতেই দরজা লক করে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে ইনজাদ। বিছানার ওপর কৌতূহলী চোখে বসে আছে রেহাংশী। দরজা ভেজিয়ে বিছানায় বসল সে। মাথার দিকে বালিশটা একটু উঁচু করে পিঠ আর মাথার সন্ধিস্থলে রাখল। পা দুটো টান টান করে রেহাংশীর দিকে তাকাল। তার প্রশ্নবিদ্ধ চোখের প্রত্যুত্তর করল সে।
“মেহমাদ বাড়ি যাচ্ছে। ওর বাবা অসুস্থ।”
সচল হলো রেহাংশীর কৌতূহল। নতমুখী হয়ে শাড়ির আঁচল কচলাতে থাকল। ইনজাদ চোখ খিচে বলল—
“তোমার অন্ধকারে কী সমস্যা?”
“কোনো সমস্যা নেই?”
“তাহলে?”
“অন্ধকারে আমি ঘুমাতে পারি না।”
ইনজাদ হালকা শব্দে হাসল। চোখ তুলে তাকাল রেহাংশী। মুখ গম্ভীর করতেই ইনজাদ রসালো গলায় বলল—
“তাহলে অন্ধকারে রাতে হাঁটাহাঁটি করো কেন?”
“ভালো লাগে।”
“আজব তো! অন্ধকারে ঘুমাতে পারো না, কিন্তু হাঁটতে পার! এ কেমন কথা?”
“এমন কথা।”
আচানক রেহাংশীর হাত টেনে তাকে বুকের পাটাতনে নিয়ে নেয় ইনজাদ। খরগোশ ছানার মতো তুলতুলে দেহের ছোঁয়ায় আবেশিত সে। রেহাংশী দ্রুত সরতে গেলে তার কোমরে সজোরে চাপ দিয়ে ধরে সে। হতবাক হয়ে যায় রেহাংশী। তার শরীরের সমস্ত ভার ইনজাদের বক্ষস্থলে। ইনজাদ এক হাতে রেহাংশীর হাত খোঁপা খুলে দেয়। ছড়িয়ে পড়ে রেশম কালো চিকুর। ইনজাদ প্রগাঢ় মায়ায় ছড়ানো চুলে গুঁজে দেয় রেহাংশীর কানের পেছনে। উষ্ণ চুম্বন করে তার ললাটে। ছটফটানো রেহাংশীর অন্তঃকরণ অনুপলেই নিভে যায়। অতলান্ত ভালোবাসার ঘোর লাগে তার পদ্মাক্ষীতে। অনিমেষ চেয়ে থাকে স্বামী নামক ব্যক্তিটির দিকে। হৃৎস্পন্দন যেন গুনে গুনে চলছে। শ্বাস ভারী হচ্ছে। ইনজাদ নিগূঢ় হাসল। প্রশ্ন করল—
“ভালোবাসো আমাকে?”
সলজ্জ চোখ অবনত করে রেহাংশী। উত্তাল সায়রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার অনভূতির শিখরে। ইনজাদের স্পর্শ গাঢ় হলো। প্রশ্নের উত্তরের জন্য আকুলিবিকুলি করছে তার মন। কিন্তু প্রিয়তমা নির্লিপ্ত। ইনজাদ ফের বলল—
“অধিকার নেই আমার?”
লতানো দেহ শিথিল হলো। কণ্ঠ হারাল স্বর। চোখ উঠল ভিজে। অভাবিত এই অনুভূতির আস্বাদন তো ভয়ংকর! রেহাংশী নেতিয়ে গেল ইনজাদের বুকের ওপর। সহসা অবিশ্বাস্য কাজ করে বসল ইনজাদ। রেহাংশীকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর নিজের ভর ছেড়ে দেয়। বিভ্রান্ত, বিমূঢ় রেহাংশী। ইনজাদ বলল—
“নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। ভালোবাসি আমৃত্যু। এখন আমার অধিকার চাই। শুদ্ধ পুরুষ হয়ে থাকাটা বড্ড কঠিন!”
রেহাংশীকে অবাকের শীর্ষে পৌঁছে দিয়ে তার ওষ্ঠাধরে গাঢ় স্পর্শ আঁকতে থাকে ইনজাদ। রেহাংশী আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার নারীসত্তায় ঝংকার শুরু হলো। শিরা-উপশিরায় বয়ে গেল বিষ। যার ক্রিয়ায় সে কাতর, অসহায়। রেহাংশীর কাতরতা আরও বাড়িয়ে দিলো ইনজাদ। চোখের পাতায়, নাকের ডগা থেকে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত ভিজিয়ে তুলল ভালোবাসার গহন ছোঁয়ায়। বিবশ রেহাংশীর সমস্ত দেহ শ্রান্ত। ইনজাদ হাসল। রেহাংশীর চোখে চোখ রেখে বলল—
“মাশা আল্লাহ! ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য। আমাকে পূর্ণতার শিখরে চড়ার আহ্বান করার জন্য। ”
রেহাংশী মাথা কাত করে। তার শ্বাসে চলছে বাঁধা। তাকাতে পারছে না। ইনজাদ ঝুঁকে গেল পুরোদস্তুর। প্রিয়তমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল—
” ও বিষবাণ!
হৃৎপিন্ডের ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে যার করেছ সর্বনাশ, বিনা দোষে যে হয়েছে নির্বাসিত। যার নিরপদ্রুপ, অবিমিশ্র অন্তঃকরণের প্রণয়িনী তুমি, তোমার নেত্রযুগলের নিঃসৃত নীল বিষ যার বক্ষস্পন্দন থমকে দেয়, গহন বিষক্রিয়ায় জীবন্মৃত সে।
রেহাই দাও, করুণা করো, বাঁচতে দাও তাকে!
তার বিষাক্ত অঙ্গে ঢেলে দাও তোমার অমৃত। তার খন্ডিত হৃৎপিন্ড জুড়ে দাও তোমার অমৃতবাণে।
ও বিষবাণ!
ও বিষবাণ!
ও বিষবাণ!
,
,
,
ব্যস্ত হাতে থালা-বাসন ধুয়ে তা রেকের ওপর সাজিয়ে রাখছে রেহাংশী। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ইনজাদ। নগ্ন বুক জুড়ে জলকণার আবাসস্থল। পায়ের গোড়ালি আড়াআড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকে দেখেও যেন দেখল না রেহাংশী। চোখ তুলল না ভয়াবহ লজ্জায়। নত মস্তিষ্কে চলছে দ্রুত হস্তের কাজ। ইনজাদ গা দুলিয়ে হাসল। রেহাংশীর কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ি ভেদ করে উদর দৃশ্যমান। ভেজা চুল লেপ্টে আছে মসৃণ, পেলব কোমরে। ইনজাদ নরম পায়ে রেহাংশীর পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। কম্পন শুরু হলো ত্রস্ত দেহে। ইনজাদ ঘাড় নিচু করল। চুলে ডোবাল ঘ্রাণেন্দ্রিয়। লম্বা নিঃশ্বাস টেনে নিল। তুষ্ট হলো হৃদয়। রেহাংশী হাসল। লজ্জামিশ্রিত গূঢ় হাসি। তার গলার দিকটায় ঘাম জমেছে, জমেছে নাকের ডগায়। ইনজাদ চুল থেকে নাক সরালো। অসংবৃত কোমরে হাত গলিয়ে দিতেই শিউরে উঠল রেহাংশী। মরমর চোখে চাইতেই মিইয়ে গেল তার সচল ভঙ্গি । ইনজাদ ঠোঁট ছোঁয়াল গালে। কপালের ঘাম মুছে দিলো। কোমরে গুঁজে থাকা আঁচল খুলে নিল। হালকা হাতে চেপে চেপে গলদেশের ঘাম মুছে দিলো। আদেশের সুরে বলল–
“রান্নাঘরে কাজ করলে অ্যাডজাস্ট ফ্যান অন করে নেবে। তাতে গরম বাতাস বের হয়ে যাবে।”
রেহাংশী হালকা করে মাথা দুলালো। ইনজাদ নিজের হাতে রেহাংশীর ভেজা চুলগুলো কাঁধের একপাশে নিয়ে আসে। চোখ তুলল রেহাংশী। অর্ধ নিমীলিত চাহনি। ইনজাদের স্পর্শে দূর্বল হতে লাগল সে। অস্ফুট আওয়াজে বলে উঠল—
“কাজে যাবেন না?”
“যাব।”
“কখন?”
“সময় হলে।”
“সময় হয়নি?”
“তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
ক্ষীণ চাহনি নিভে এলো। স্বামীর বুকে মাথা রাখল রেহাংশী। এত সুখ তার কপালে ছিল! ভাবতে ইচ্ছে হয় না। যদি মিথ্যে হয়ে যায়? এই প্রেম, এই ভালোবাসা, এত এত অনুভূতি, একটু ছুঁয়ে দেওয়ার সুখ যদি মোহঘোর হয়! চোখ ফেটে জল আসে রেহাংশীর। অচিরেই শক্ত হয় হাতের বাঁধন। ইনজাদ শব্দ করে ওঠে।
সচেতন হয় রেহাংশী। ইনজাদের বুক থেকে হাত নামিয়ে আনে। ইনজাদ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইল রেহাংশীর ঘামের নহরে যা ছড়িয়ে আছে তার চোখের আশেপাশে। স্নেহার্দ্র সুরে বলল—
“শুধু ভালোবাসলে হয় না, তার যত্ন নিতে হয়।”
চট করেই রেহাংশীকে কোলে তুলে নেয় ইনজাদ। ভীতসন্ত্রস্ত রেহাংশী চেঁচিয়ে ওঠে।
কীঈঈঈকী করছেন? পড়ে যাব!”
আদুরে ভঙ্গিতে রেহাংশীর নাকে নাক ঘষে বলল—
“চিন্তা করো না। নিজের স্ত্রীকে সামলানোর মতো ক্ষমতা তোমার স্বামীর আছে। শুধু শারীরিক তৃপ্তি নয় আমি চাই তুমি আমার মানসিক প্রশান্তির কারণ হও।”
স্বামীর স্নেহময়ী বাক্যে আপ্লুত রেহাংশী। নিজের কক্ষে এনে তাকে বিছানায় বসায় ইনজাদ। কাবার্ভের ড্রয়ার থেকে কিছু একটা বের করে এনে রেহাংশীর সামনে বসে। স্বাভাবিক সুরে বলল—
“আঁচল তোলো?”
রেহাংশী হতভম্ব গলায় বলল—
“কেন?”
“এত প্রশ্ন কেন করো?”
একটানে রেহাংশীর পুরো আঁচল উঠিয়ে কাঁধে তুলে দেয় ইনজাদ। কিছু একটা তার কোমরে পরিয়ে দেয়। রেহাংশী কৌতূহল দমাতে নিম্নমুখী দৃষ্টি রাখে। তার কোমরে শোভা পাচ্ছে একটা কোমরবন্ধনী। ইনজাদ ঠোঁট ছড়াল। আবেশিত গলায় বলল—
“দেখো পছন্দ হয় কি না?”
একটা সরু চেইন। তার সাথে লাগোয়া সাদা রঙের পাথর যা ইনটেক করা তামার বেষ্টনে। রেহাংশী উৎসুক গলায় বলল—
“এইটা কখন এনেছেন?”
“অনেক আগে। মেহমাদ একবার ওর গার্লফ্রেন্ডের ডান্স কম্পিটিশনের জন্য কিনেছিল। সেইটা অবশ্য আরও গর্জিয়াস ছিল। এইটা একদম সিম্পল। তুমি সবসময় পরতে পারবে। ব্যস, আমার কাজের সময় সমস্যা না হলেই হলো।”
রেহাংশী দাঁত-মুখ খিঁচে দুর্বল ধাক্কা মারে ইনজাদের বুকে। অসচেতনতায় নিচে বসে পড়ে সে। খলখল করে হেসে উঠে দাঁড়ায়। কাবার্ড থেকে ফিকে শৈবাল রঙের একটা শার্ট বের করে গায়ে গলিয়ে নিয়। বোতাম আটকে টাইয়ের নব বাঁধতে বাঁধতে বলল—
“দুপুরে খেয়ে নেবে কিন্তু। খেয়ে আমাকে ফোন করবে। টেবিলে মোবাইল চার্জে আছে। এইটা আমার পুরোনো সেট। বাইরে গেলে রিচার্জ করিয়ে দেবো। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলেই আমাকে জানাবে। নাম্বার সেভ করে দিয়েছি। শুনেছ কী বলেছি?”
“হুম।”
“হুম, হ্যাঁ বললে চলবে না। ঠিক মতো খেতে হবে। আর না হলে….।”
“না হলে কী?”
“না হলে সাজা পেতে হবে।”
জলেসিক্ত আঁখিযুগল বন্ধ করে নিল রেহাংশী। অদ্ভুত মাদকতায় সম্মোহিত সে। ইনজাদ গাল ছুঁইয়ে দিলো। জাগ্রত হলো বদ্ধ নয়ন। চোখের মনিতে চোখ রেখে মখমলে গলায় বলল—
“প্লিজ খেয়ে নিয়ো।”
রেহাংশী অনুগত সহচরের মতো মাথা দুলালো। আগ্রহী গলায় বলল—
“সেদিন নুহাশ ভাইয়া আসেনি কেন?”
ইনজাদ নিভন্ত গলায় উত্তর করল।
“জানি না।”
“বাড়ির সবাই আমার ওপর রেগে আছে তাই না?”
ইনজাদ কণ্ঠ তীক্ষ্ম করে বলল—
“বলতে পারব না। তোমাকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। সময় ক্ষত পূরণ করে। সময় দাও।”
রেহাংশীর কপালে ছোট্ট চুমু খায় ইনজাদ। গাঢ় মায়ায় বলল—
“আসি, খেয়াল রেখো নিজের।”
এক বুকভরা চিন্তা নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয় ইনজাদ। তার অবশ চলাচলে মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় আচ্ছন্ন রেহাংশীর ওই মুখশ্রী। মেয়েটাকে সে এই জনমে আর ভুলতে পারবে না!
চলবে,,,
#মোহঘোর
#পর্বঃ১৬
লেখনীতেঃতাজরিয়ান খান তানভি
গত এক সপ্তাহের হিসাব সংরক্ষণ বই খতিয়ে দেখছে ইনজাদ। ব্যস্ত ভঙ্গিতে পাতা উলটিয়ে যাচ্ছে। তার জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা আছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের একপাশে বসে নিজের কাজে মনোযোগী সে। থাই গ্লাসের অস্পষ্ট আওয়াজে চকিতে চোখ তুলল ইনজাদ। ছোট্ট, গোলগাল মুখের তিমন থাই স্লাইড করে মাথা ঢোকাল। অনুরক্তির সুরে বলল—
“স্যার আসব?”
ইনজাদ নীরব সম্মতি দিলো। ছোটো ছোটো পায়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে প্রবেশ করল তিমন। ইনজাদ প্রশ্ন ছুড়ল—
“কিছু বলবে?”
“হুম।”
“কি?”
“আমাকে একটু যেতে হবে স্যার।”
ইনজাদ দেয়াল ঘড়িতে তাকাল। ভ্রূ কুঞ্চি করে বলল—
“এখনো তো চারটা বাজেনি!”
“আমার একটু দরকার ছিল স্যার। গতকাল মানান স্যারকে জানিয়ে ছিলাম।”
“আচ্ছা যাও। যাওয়ার আগে সাইন করে যেয়ো। আর কাল ঠিক সময় মতো চলে এসো।”
“জি স্যার।”
ইনজাদের সম্মতি পেয়ে দেরি করল না তিমন। চলার গতি বাড়িয়ে বেরিয়ে এলো। বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রথম শিফট। কিন্তু তিমন জরুরি প্রয়োজনে আগেই যেতে চাইছে।
নিজের কাজে মনোনিবেশ করে ইনজাদ। গত এক সপ্তাহের লাভ-ক্ষতির হিসেব কষছে সে। বিরক্তি এলো নাকের ডগায়। বেসুরে বেজে উঠল মোবাইল ফোন। ইনজাদ দৃষ্টি আবদ্ধ করল। পারভেজ মির্জা কল করেছেন। প্রশান্তি নেমে এলো ইনজাদের চোখের পাতায়। বদ্ধ অন্তঃকরণে হিমেল হাওয়া বইল। কল রিসিভ করেই দাঁড়াল বদ্ধ কাঁচের জানালার কাছে।
“আসসালামু আলাইকুম,বাবা। কেমন আছ?”
পারভেজ মির্জা সহজ গলায় বললেন—
“ভালো। তুই কেমন আছিস?”
“ভালো। আম্মার কী খবর? মামা-মামি চলে গেছে?”
“হ্যাঁ। আজ সকালেই চলে গেছে ওরা।”
ইনজাদ ভড়কাল। তমালিকার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। কান থেকে মোবাইল সরিয়ে তাকে শান্ত হওয়ার আহ্বান করছেন পারভেজ মির্জা। কিন্তু হিতে বিপরীত। আরো জোরে চিৎকার করছেন তিনি। চিন্তিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে ইনজাদ—
“কী হয়েছে বাবা? আম্মা চিল্লাছে কেন?”
পারভেজ মির্জা সময় নিলেন। কণ্ঠে মলিনতা। রয়ে সয়ে বললেন—
“একটা কথা বলার ছিল তোকে।”
ইনজাদ কণ্ঠের অস্বাভাবিকতা বুঝতে পেরে বলল—
” কী হয়েছে বাবা? এমন করে কথা বলছ কেন? আর তুমি কবে থেকে পারমিশন নিতে অভ্যস্থ হলে আমার কাছ থেকে। ছেলে হই তোমার।”
পারভেজ মির্জা বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলেন। ইনজাদ চতুর গলায় বলল—
“রতন আবার এসেছিল? ঝামেলা করেছে কোনো?”
“না, ওকে তোর মামা-ই সাবধান করে দিয়েছে।”
“তবে..?”
“আসলে পাড়ার লোকেরা কীসব বলাবলি করছে। আর রতনও সেদিন কীসব বলে গেল!”
ইনজাদ ব্যস্ত হয়। পেলব ললাটে ভাঁজ ফুটে ওঠে। চোয়ালের পেশি শক্ত হয়। ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয় অচিরেই। গাঢ় গলায় বলল—
“প্লিজ বাবা, কী হয়েছে খুলে বলো।”
পারভেজ মির্জা গাঢ় শ্বাস ফেললেন। উত্তুরে শীতল হাওয়ার স্পর্শের মতো জারকাটা দিয়ে উঠল তার শরীর। তমালিকার ভৎসনা বন্ধ হলো না। দ্বিগুন বেগে উগড়ে দিচ্ছেন তিনি। পারভেজ মির্জা শ্রান্ত সুরে বললেন—
“সবাই বলাবলি করছে কয়েক বছর আগে না কী এহসাসকে রেহাংশীর জন্য জেলে দিয়েছিল জুলহাস খন্দকার।”
থমকে গেল ইনজাদের পৃথিবী। ধূসর আঁধার নেমে এলো তার চোখের সামনে। শরীরের নিম্নাংশ স্থবির হয়ে এলো। মানান ঢুকল চট করে। ইনজাদকে লক্ষ্য করে কিছু একটা বলল। কিন্তু তা কর্ণকুহর হলো না তার। হাতের ইশারায় যেতে বলল ইনজাদ। পারভেজ মির্জা আরও বললেন—
“সবার ধারণা রেহাংশীর সাথেই…। আমার তা মনে হয় না। মেয়েটাকে আমি যতদূর চিনেছি ও এমন কাজ করতে পারে না।”
“তুমি খন্দকার সাহেবের সাথে কথা বলেছ?”
“না। তিনি অসুস্থ। নুপূরকে নিয়ে যাওয়ার দিন প্রচুর ঝামেলা করে মামুন। হাতাহাতির এক পর্যায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হোন খন্দকার সাহেব। আর এমনিতে তারা আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে অপারগ। মিসেস খন্দকার এই সম্পর্কে একটুও খুশি নন।”
ইনজাদ ঘামতে শুরু করল। এসির শীতলতা তার ভেতরকার উষ্ণতা কমাতে পারছে না। লাইন কেটে দিয়ে চেয়ারে বসল। সামনে থাকা শোকেসে তাকাতে নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটা দৃষ্টিগোচর হলো তার। আর ভাবতে পারছে না ইনজাদ। রেহাংশীর জীবনে সে প্রথম পুরুষ নয়?
,
,
,
গাঢ় আঁধার। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো আপন মহিমায় জ্বলছে। গভীর রাত। বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল কমে গিয়েছে। তবুও শহরের রাস্তা কোলাহলপূর্ণ। পবনে মিশ্রিত কালো ধোঁয়া। তূরন্ত বেগে ছুটে চলা গাড়ি। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গুটিকতক মানুষ। গলির মোড়ে ঢুকতেই শান্ত হলো সব। সিএনজি থেকে নেমে দাঁড়াল ইনজাদ। ভাড়া মিটিয়ে গেইটে আওয়াজ করল।
ঘুমে ঢুলঢুলে অবস্থা দাড়োয়ানের। দরজা খুলেই ঘুমন্ত হাসল। ইনজাদ কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। দাড়োয়ান ইদ্রিস চমকিত হলেন। হাসি লেগে থাকা ছেলেটার হাসি আজ হারিয়ে গেল কেন?
বিধ্বস্ত, বিমর্ষ পায়ে সিঁড়ি বাইছে ইনজাদ। কলিং বেল চাপতেই দ্রুতহস্তে দরজা খুলে রেহাংশী। মুখভর্তি হাসির ঝলক। চোখের কোটরে সায়রভরা খুশি। ইনজাদ গম্ভীর মুখেই ভেতরে ঢুকল। ন্যাওটা বাচ্চাদের মতো দরজা লাগিয়ে ইনজাদের পেছন পেছন পা বাড়াল রেহাংশী। প্রফুল্ল গলায় বলল—
“আজ এত দেরি করলেন কেন? বিকেলে কতবার ফোন করলাম, একবারও ধরেননি। আবার ফোনও করেননি। আজকে বুঝি খুব ব্যস্ত ছিলেন?”
ইনজাদ কথা বলল না। বুকের ভেতর দামামা বাজছে। মাথাটা টনটন করছে। বিষিয়ে উঠছে সব। রেহাংশীর হাসির ফোয়ারা থামল না। বরঞ্চ বাড়ল। আহ্লাদী গলায় বলল—
“আজ আমি একটা জিনিস রান্না করেছি। আপনার খেতে খুব ভালো লাগবে।”
ইনজাদ শার্টটা খুলেই ছুড়ে মারে। হকচকিয়ে যায় রেহাংশী। এক নিমিষে বুকটা কেঁপে উঠল তার। ভয়জড়িত গলায় বলল—
“কী হয়েছে আপনার? কথা বলছেন না কেন?”
ইনজাদ বিছানায় বসল। রক্তিম চোখ জোড়া ছড়িয়ে কর্কশ স্বরে বলল—
“এহসাসের সাথে তোমার কীসের সম্পর্ক?”
থম মেরে যায় রেহাংশী। গা কাটা দিয়ে উঠে তার। কাঁপন শুরু হয় দেহে। আচানক কণ্ঠে বিস্তার করে ঊষরতা। ইনজাদ গাঢ় গলায় ফের বলল—
“কথা বলছ না কেন? কী সম্পর্ক তোমার এহসাসের সাথে? কেন এসেছিল সে মৃধার বিয়েতে তোমার সাথে দেখা করতে?”
রেহাংশী অটল রইল। তার নেত্র সিক্ত হলো নোনা জলে। কলিজা লাফিয়ে যাচ্ছে। চিনচিন ব্যথা হচ্ছে বুকের ভেতর। ইনজাদ গর্জে ওঠে। দারাজ গলায় চিৎকার করে বলল—
“কথা যাচ্ছে না তোমার কানে? কথা বলছ না কেন? কী সম্পর্ক তোমার ওর সাথে? কেন এসেছিল ও?”
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে রেহাংশী। বুকশেল্ফের সাথে সেদিয়ে রইল। ইনজাদের রাগ বাড়ল দ্বিগুন হারে। টেবিলে থাকা বাটি ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। চেয়ারে বসাল এক ভয়াল লাথি। ছোট্ট কক্ষটায় জায়গা কম। সবকিছু গিয়ে পড়ল রেহাংশীর পায়ের কাছে। শখ করে স্বামীর জন্য পায়েস রান্না করেছিল। এখন তা গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝের বুকে। বুক কাঁপিয়ে কেঁদে উঠে রেহাংশী। গলা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে। এই ছিল তার কপালে। ইনজাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। এই মেয়ে কথা বলবে না! বলতে ওকে হবেই। ক্রোধে বিহ্বল হয়ে বলে উঠে ইনজাদ—
“কথা বলছ না কেন তুমি? কী করেছ তুমি ওর সাথে? ধোঁকা দেওয়ার জন্য আর কাউকে পেলে না? লজ্জা করছে না তোমার? সবগুলো বোন একই রকম। কেউ কারো চেয়ে কম না। ওরা তো ভালো অন্তত সত্যি বলছে। তুমি তো জঘন্য। একজনের সাথে তামাশা করে আবার আমাকে বিয়ে করেছ। ছিঃ!।”
রেহাংশী ফুঁসলে ওঠল। চোখ ভর্তি জলস্রোত বইয়ে বলল—
“চুপ করুন। কী বলছেন এসব আপনি?”
ইনজাদ তেড়ে গিয়ে সজোরে চেপে ধরে রেহাংশীর বাজু। আর্ত গলায় বলে উঠে রেহাংশী—
“আহ! ছাড়ুন। লাগছে আমার।”
রাগে থরথর করে কাঁপছে ইনজাদের বলিষ্ঠ দেহ। ফোঁস ফোঁস করছে সে।
“আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও তুমি?”
“দেবো না। ভাঙচুর কেন করছেন আপনি? এত রাগ কেন দেখাচ্ছেন? শুধু আমার ওপর সবাই রাগ করতে পারেন। দুর্বল নই আমি। অবুঝ নই। ছাড়ুন আমাকে।”
ইনজাদ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় রেহাংশী। নিজের স্বামীকে এখন আহত কোনো বাঘ মনে হচ্ছে তার। এত ভালোবাসাপূর্ণ, নরম মানুষ এতটা ভয়ংকর কী করে হয়! রেহাংশী কান্না গিলে নিল। সরব গলায় বলল—
“কোনো সম্পর্ক নেই আমার, কোনো সম্পর্ক নেই। কিচ্ছু করিনি আমি। সেদিন আমার সাথে নয় নুপূর আপুর সাথে দেখা করতে এসেছিল এহসাস ভাইয়া। কিন্তু ধরা পড়তেই আমার ওপর সব দোষ চাপিয়ে দিলো। কেউ শুনল না আমার কথা। বড়ো আম্মু দুই দিন আমাকে ঘরে আটকে রাখল, খেতে দিলো না পর্যন্ত। কেন? কী করেছি আমি? আমি অনাথ তাই? আমার কেউ নেই তাই সব আমাকেই সহ্য করতে হবে?”
ডুকরে উঠে রেহাংশী। শ্বাস থমকে যায় ইনজাদের। কী বলছে এই মেয়ে? ব্যথাতুর গলায় ডেকে ঊঠে—
“রেহাংশী!”
রেহাংশী কান্না দলিত কণ্ঠে বলল—
“আমি-ই এহসাস ভাইয়াকে খবর দিয়েছি নুহাশ ভাইয়াকে বলে। কেন দেবো না! বিবাহিত হয়েও আবার বিয়ে করতে এসেছে। হ্যাঁ, ইচ্ছে করেই করেছি সবকিছু আমি। কেন করব না? সেদিন কেন সব দোষ আমার ওপর চাপিয়ে দিলো? যখন আমি কিছুই করিনি। কেন দিলো?
হ্যাঁ, খারাপ আমি। সত্যিই খারাপ। নিন আপনার আংটি।”
সেই লুকোনো আংটি ছুড়ে মারে ইনজাদের দিকে। সে অবাক চোখে চেয়ে বলল—
“এটা কোথায় পেলে তুমি?”
“আমি সরিয়েছি। তবুও তো আপনি চুড়ি পড়িয়েছেন তাকে। এতই যখন তাকে পছন্দ কেন বিয়ে করলেন আমায়?”
নিরস্ত্র সৈনিকের মতো ভেঙে পড়ল ইনজাদ। শ্বাস ভারী করে বলল—
“রেহাংশী আমার কথা শোনো।”
“না, কোনো কথা শুনতে চাই না আমি।”
অসহনীয় শ্বাস ফেলে ইনজাদ। নাকের পাল্লা ওঠানামা করছে। চোখে কাতরতা। বুকে অসহায়ত্ব। হৃদয়ভেদী স্বরে বলল—
“আই এম রিয়েলী সরি রেহাংশী। জান আমার কথা শোনো প্লিজ।”
ইনজাদ এগিয়ে যেতে ঝাঁঝিয়ে উঠে রেহাংশী। হুংকার ছেড়ে বলল—
“একদম ছোবেন না আমাকে। আমার কাছে আসবেন না।”
ইনজাদ ক্ষীণ গলায় বলল—
“একটু বোঝার চেষ্টা করো। বললাম তো সরি। প্লিজ বিষবাণ! এমন কোরো না প্লিজ।”
“না, আপনারা সব পুরুষ এক। শুধু নারীরাই কেন দোষী হয়? কেন সব দোষ নারীদের?”
রেহাংশী থামল না। বাতাস ভারী করে তুলল সে। ইনজাদ ভীতসন্ত্রস্ত। মেয়েটা কাঁদছে আর তার ভেতরটা মুছড়ে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে বুকের পাটা, ছিড়ে যাচ্ছে কলিজা, ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে হৃৎপিন্ড। সহ্য করতে পারছে না ইনজাদ। এ কেমন মোহঘোর! না কী সত্যিই ভালোবাসা!
আচানক গা গুলিয়ে উঠে রেহাংশীর। শরীরের সর্বত্র ঝিমুনি দিয়ে ওয়াশরুমে ছুট লাগায়। ঘোলা চোখে ওয়াশরুমের দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় ইনজাদ। ডেকে উঠল—
“রেহাংশী! রেহাংশী! ঠিক আছ তুমি?
চলবে,,,