মোহঘোর #পর্বঃ৩৬,৩৭

0
332

#মোহঘোর
#পর্বঃ৩৬,৩৭
লেখনীতেঃতাজরিয়ান খান তানভি
৩৭

ম্লান চোখে তাকিয়ে আছে রেহাংশী। তার অস্থির অন্তঃকরনে শরতের নিরবধি উড়ে চলা মেঘের মতো সহস্র প্রশ্নের বহর।
ইনজাদ সরব চোখে চাইল। খাওয়ার মাঝে বিরতি দিয়ে স্ত্রীর কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—

“না খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?”

রেহাংশী চোখে নামাল। প্লেট ভর্তি খাবারের মধ্যে হাত ডুবিয়ে বলল—

“সিন্ধুজার বয়স কত?”

ইনজাদ চিবুতে থাকা দন্তপাটির নিষ্পেষণ বন্ধ করল। মোলায়েম চোখে চেয়ে মৃদু হেসে বলল—

“মেয়ে মানুষদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। পাপ হয় এতে বুঝলে!”

রেহাংশী ভার গলায় বলল—

“সিন্ধুজা বিয়ে করছে না কেন?”

ইনজাদে চোখে ঈষৎ বিরক্তি ফুটে ওঠল। গ্লাস নিয়ে পানি পান করে সতেজ গলায় বলল—

“ও কেন বিয়ে করছে না তা আমি কী করে বলব? আজব প্রশ্ন করো তুমি আজকাল! আর ও এত পড়াশোনা করেছে চুলো ঠেলতে নয়। বিজনেসের প্রতি প্রবল ঝোঁক ওর। এত পড়াশোনা, কিছু তো করুক। তারপর না হয় বিয়ের কথা ভাববে।”

রেহাংশী নিভে গেল। নিষ্প্রভ চোখে চেয়ে বলল—

“আমি তো পড়ালেখা পারি না।”

“পড়ালেখা পারো না এইটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। উচ্চ শিক্ষা নিতে পারোনি। আমাদের সমাজে এমন অনেক মেয়েরা আছে। গ্রামে এর পরিমাণ আরো বেশি। আর তুমি করতে পারোনি তোমার পাগলা গারদের মানুষদের জন্য। বলেছি তোমাকে আমি। তুমিই তো রাজি হলে না।”

রেহাংশী মৌনতার জলেশ্বরে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। ইনজাদ ফের বলল—

“জরুরি নয়, সবাইকে উচ্চ শিক্ষা নিয়েই কিছু করতে হবে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হয় তার শ্রেষ্ঠ কাজের জন্য। মাদার তেরেসাকে স্বরণ করা হয় তার নিঃস্বার্থ কাজের জন্য। মেয়েরা এখন কোনো কিছুতে পিছিয়ে নেই। মর্তভূমিতে যেমন তাদের বিচরণ, তেমন আকাশ পথেও তাদের আধিপত্য। মেয়েরা কৃষিকাজ যেমন করে, তেমন প্লেনও ওড়ায়।
এছাড়াও আছে অনলাইন বিজনেস, বিভিন্ন ব্লগ, আমাদের দেশীয় কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প; কোথায় নেই মেয়েরা? সবকিছুতে উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একাগ্রতা, নিষ্ঠা, অদম্য ইচ্ছা শক্তির। রান্না দিয়ে আজকাল মানুষ বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। অনলাইনে খাবার ডেলিভারির মাধ্যমে নিজের পরিচিতি বাড়াচ্ছে, নিজের নাম কামাচ্ছে। তুমি চাইলে অবশ্যই আমি তোমাকে মানা করতাম না।”

ইনজাদের খাওয়া প্রায় শেষ। সে তার খালি প্লেট নিয়ে উঠে চলে যায় বেসিং এর কাছে। রেহাংশী ক্ষুণ্ণ গলায় বলল—

“আমি তো এসবের কিছুই পারি না।”

ততক্ষণে ইনজাদ রেহাংশী কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় নিচু করে পেছন দিক থেকে তার গালে টুপ করে চুমু খেয়ে বলল—

“তোমাকে কিছু পারতে হবে না। ভালোবাসতে পারো তো! তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”

ইনজাদ শয়ন কক্ষের দিকে পা বাড়ায়। রেহাংশী স্থির হয়ে বসে রইল। সে তো কিছুই পারে না। কোনো গুন নেই তার। গুনহীন এই ক্ষণস্থায়ী রূপ দিয়ে কতদিন ধরে রাখবে নিজের স্বামীকে? এই শহরটা বড্ড নোংরা ! তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। রেহাংশীর ভয় হয়। এই বুঝি তার সব শেষ হয়ে গেল?
,
,
,
আবছা মোলায়েম, স্নিগ্ধ, কোমল আলোর অবিশ্রান্ত পরশ। রেহাংশীকে বুকের মাঝে জড়িয়ে রেখেছে ইনজাদ। রেহাংশীর উষ্ণ শ্বাস তার বুক পাঁজরে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রণয় স্রোতোস্বিনীর অতল সাতরে ক্লান্ত রেহাংশী। ইনজাদের উষ্ণ দেহের সাথে নিজেকে আরোও জড়িয়ে নিল সে। প্রস্ফুটিত আঁখিযুগের মোহবিষ্ট চানিতে দেখতে লাগল ইনজাদের জাগরূক আনন। স্বামীর উষ্ণ, নিরন্তর প্রশ্বাস এই হিমরাতেও রেহাংশীকে বিগলিত করছে। সন্তর্পণে আঙুলের আলতো পরশ আঁকতে থাকে ইনজাদের চোখের পাতায়, গালে, ঠোঁটে। ইনজাদের সপ্রতিভ মস্তিষ্ক হেসে ওঠে। অশিথিল পেষনে সূচ পরিমাণ দূরত্ব দূর করে নেয় নিজেদের মধ্যকার। চোখ খুলে ইনজাদ। তার নির্বাক, আদুরে, মায়াময় চাহনিতে লজ্জাতে মিইয়ে যায় রেহাংশী। দুর্দমনীয় প্রেমময় সংসর্গে তার স্থির কায়াতে উঠে নিগূঢ় কম্পন। স্বামীর ছোঁয়ায় ধাতস্থ হয়ে প্রশ্ন করে রেহাংশী–

“কাল কখন যাব আমরা?”

নেশার পরিমাণ কমেনি। বাড়তে লাগল দ্বিগুন হারে। ইনজাদ অপারগ স্বরে বলল—

“কাল সকালে দিয়ে আসবো তোমাকে।”

“আর আপনি?”

“বিয়ে পরশু রাতে। আমি পরশু রাতেই যাব।”

“কী বলছেন?”

রেহাংশীর কণ্ঠে ভয়ের আভাস পেল ইনজাদ। মাথাটা হালকা তুলে ওষ্ঠাধরের মদিরা পান করল। সংকীর্ণ স্বরে বলল—

“মেহমাদ এমনিতেই আমার ওপর রেগে আছে। তোমাকে দুই দিন আগে পাঠাতে বলেছে। ওকে তো আর বলতে পারিনি, আমার বউ আবার আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না।”

রেহাংশী স্নেহার্দ্র ভরা এক কিল বসায় ইনজাদের অসংবৃত বুকে। টপাটপ চুমুর বর্ষণ ঘটায় ইনজাদ। স্বামীকে বাধা দিতে পারল না রেহাংশী। তার শাড়ির আঁচল ঝুলে আছে বিছানা থেকে মেঝেতে। ইনজাদ গাঢ় হেসে বলল—

“চিন্তা করো না। আঙ্কল -আনটি তোমাকে দেখে রাখবে। একটা রাতের-ই তো ব্যাপার! আর বিয়ে বাড়িতে কেউ ঘুমায় না কি?”

রেহাংশী ছোট্ট করে হাসল। ইনজাদ হাত গলাল রেহাংশীর অবিন্যস্ত চুলে। রেহাংশী একটু উঁচু হয়ে ইনজাদের মুখের কাছে নিল নিজের মুখ। ইনজাদের বুকে হাত রেখে ছোট্ট শ্বাসে বলল—

“দেখে রাখবে কেন? আমি কী বাচ্চা?”

“বাচ্চা নয়তো কী? এই যে অন্ধকারে ঘুমাতে পারো না!”

“অন্ধকারে ভয় হয় আমার। সব হারিয়ে যায় অন্ধকারে। আমি আমার সব হারিয়ে ফেলেছি অন্ধকারে। আপনাকে হারাতে পারব না। পারব না।”

রেহাংশীর চোখের আচানক বর্ষণে চমকে যায় ইনজাদ। দুই হাতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে বলল—

“কোথাও যাব না আমি তোমাকে ছেড়ে, কোথাও না।”

রেহাংশী শ্রান্ত গলায় ফুফাতে লাগল। ইনজাদ তাকে বক্ষস্থলে পরম মমতায় আঁকড়ে রাখল। ঘরের অন্ধকারে রেহাংশীর এত কেন ভয় তা আজও জানতে পারল না ইনজাদ।
,
,
,
সায়াহ্ন প্রহর! সাঁঝবাতির স্বরূপ জেগে উঠেছে রুপালি চাঁদ। কালচে আকাশের মোহজালে কী নিদারুণ তার জাগ্রত রূপ!
চন্দ্রাতপে মুগ্ধ ধরণী। ঘন কালো তমসা ছিন্নভিন্ন করে চন্দ্র কিরণ মেখে দিচ্ছে পরম আদরে।

কৃত্রিম বাতির আলোকচ্ছটায় ঘোর লেগে যাবে যে কারো! কমিউনিটি সেন্টারের চারদিকে উজ্জ্বল বাতিদের যেন স্বয়ংম্বর চলছে! রেহাংশী চোখ ধাঁধিয়ে তা দেখছে। আলোয় আলোয় তার চোখ নিভে আসছে।
গতকাল সে মেহমাদদের বাড়িতেই ছিল। মেয়েটা একটুও ঘুমাইনি। না ঘুমাতে দিয়েছে ইনজাদকে। বিছানায় কাত হয়ে শুতেই চোখে লেগে এসেছিল রেহাংশীর। মেহমাদ জাগায়নি তাকে। লাইট অফ করে চলে গিয়েছিল। আচানক চোখের পাতা খুলতেই ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল সে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটে এসেছিল সকলে। রেহাংশীকে থামাতে না পেরে মেহমাদ ফোন করেছিল ইনজাদকে। সেই মাঝরাতে ইনজাদকে ছুটে আসতে হয়েছিল মেহমাদের চাচার বাসায়। এরপর বাকিরাত ইনজাদের বুকেই সমাহিত ছিল রেহাংশী। এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি ইনজাদের গেঞ্জি। খামচে ধরে রেখেছিল। সকালে সেই নির্ঘুম চোখ নিয়ে বাসায় ফিরে গিয়েছিল ইনজাদ। সেখান থেকে ফ্রেশ হয়ে রেস্তোরাঁয় গিয়েছিল। বিকেলে বাসায় ফিরে, ফ্রেশ হয়ে কমিউনিটি সেন্টারে এসেছে।

“কী দেখো এমন করে?”

রেহাংশী অবাক গলায় বলল—

“শহরের বিয়েতে কত খরচ!”

“খরচ সব জায়গাতেই হয়। তবে এইটা নিজস্ব ব্যাপার। কেউ বাড়ির ছাদে শামিয়ানা খাটিয়ে হল খরচ বাঁচায়, কেউবা নিজের খুশিকে বিস্তৃত করে। বিয়েতো আর বারবার করবে না।”

রেহাংশী আলতো চোখে তাকাল। কালো রঙের স্যুট পরেছে ইনজাদ। রেহাংশীর পরনে খয়েরী রঙের জামদানি শাড়ি। সাথে ডার্ক মাল্টিকালারের ফুলস্লিভ ব্লাউজ। মাথায় আস্ত খোঁপা। তাতে গোলাপের গুচ্ছের সাথে বেলি ফুলের সরু লহর যা দিয়ে খোঁপাকে পেচিয়ে রেখেছে। গলায় কিছু না থাকলেও কানে ঝুলছে বড়ো বড়ো দুটো ঝুমকো। রেহাংশী নিবিড় মায়াচ্ছন্ন হয়ে ইনজাদের হাত ধরল। নিঃশব্দ হাসল ইনজাদ। চকিতে ভেসে এলো মেয়েলী সুর।

“হাই! ”

দুই জোড়া চোখ চট করেই সামনে তাকাল। ক্ষণপলেই কুঁচকে গেল রেহাংশীর ভ্রূ যুগল। সিন্ধুজা এসেছে। তার পরনে একই রকম গাউন যেমনটা ইনজাদ রেহাংশীর জন্য এনেছিল, শুধু রঙটা আলাদা। গাঢ় খয়েরী! অনাবৃত গলায় ডায়মন্ডের হালকা হার, কানে দুল। রেশম কালো চুলে নেই বাধ্যবাধকতা। আজও তারা উন্মুক্ত রোজকার ন্যায়। রেহাংশীর কৌতূহলী, অপ্রসন্ন, ভীত চোখজোড়া ইনজাদের দিকে নিবদ্ধ হলো। ইনজাদ গাঢ় মায়ায় হাসছে। শ্বাস ভারী হলো রেহাংশীর!

চলবে,,,

#মোহঘোর
#পর্বঃ৩৭
লেখনীতেঃ তাজরিয়ান খান তানভি

নির্নিমেষ চেয়ে রইল রেহাংশী। অন্তঃরিন্দ্রিয়তে আছোঁয়া ভয় ধীরে ধীরে অঙ্কুরোদগম হচ্ছে। ইনজাদ মাথাটা হেলিয়ে ফিসফিসানো গলায় বলল—

“তোমাকে কিন্তু ওর চেয়ে বেশি সুন্দর লেগেছে। অবশ্য ওটা ছাড়াও তোমাকে….।”

ইনজাদের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই রেহাংশী ক্ষুদ্র চোখে তাকাল। হেসে ফেলল ইনজাদ। এগিয়ে এলো সিন্ধুজা। ইনজাদ সজীব গলায় বলল—

“এত দেরি করলে যে?”

সিন্ধুজা খানিকটা বিরক্তি নিয়েই বলল—

“আর বলো না। মম ড্রেস চুজ করতেই ঘণ্টা পার করে দিয়েছে।”

“ম্যাম আসছেন? কোথায় তিনি?”

“ড্যাডের সাথে আসছে।”

“ওও।”

রেহাংশীর নির্লিপ্ত দৃষ্টি ঠাওর করে বলে উঠে সিন্ধুজা—

“কেমন আছ রেহাংশী?”

“এই জামাটা…?”

সিন্ধুজা নিজের দিকে তাকাল। ইনজাদ অপ্রস্তুত হলো রেহাংশীর ছোড়া প্রশ্নে। সিন্ধুজা দিলখোলা হেসে বলল—

“একচুয়েলী, বাংলাদেশ থেকে তেমন কিছু কেনা হয় না। সেদিন তোমার জন্য ইনজাদ গাউনটা পছন্দ করল, ডিজাইনটা দেখে আমারও পছন্দ হয়। ভাবলাম সামনে মেহমাদের বিয়ে তো নিয়ে নেই। তাই নিয়ে নিলাম।”

কথা পাল্টালো সিন্ধুজা। চাহনি পরিবর্তন করে ইনজাদের দিকে বিদ্ধ করল। ঝলমলে গলায় বলল–

“মেহমাদ কোথায়? চলো তো তিয়ার সাথে কথা বলে আসি।”

ইনজাদ সম্মতি দিতেই পা বাড়ায় সিন্ধুজা। রেহাংশী বরফখন্ডের মতো স্থির হয়ে রইল। ইনজাদ হালকা গলায় বলল—

“চলো রেহাংশী।”

কেমন আড়ষ্ট হয়ে রইল রেহাংশী। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিস দেখে ফেলল সে কিছুক্ষণ আগেই! ইনজাদ ভাবুক চোখে তাকিয়ে বলল—

“কী হলো? চলো!”

রেহাংশী স্থবিরতা কাটিয়ে অস্থির গলায় বলল—

“আমরা বাসায় কখন যাব?”

ইনজাদ বেশ অবাক হলো। চমকে উঠে বলল—

“সবে বিয়ে হয়েছে রেহাংশী! আর এত তাড়া কীসের?”

রেহাংশীর চোখের সাথে তার মুখচ্ছবির উজ্জ্বলতাও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অনিচ্ছা সত্তেও ইনজাদের পেছন পেছন চলতে লাগল। বিশাল হল রুমের মাঝ বরাবর সিমেন্টের উঁচু পাটাতন। হাতে গোনা তিনটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। পাটাতনের ওপর সাদা রঙের পাতলা কাপড় বিছানো, আর তাতে ছেড়া গাঁদাফুলের ছড়াছড়ি। পেছনে ফুলের মেলা। থোঁকা থোঁকা গোলাপ আর অর্কিডের বহর। তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ!
টুকটুক করে তিয়ার সাথে কথা বলছে সিন্ধুজা। তিয়ার গায়ে লাল খয়েরী রঙের বেনারসি। তার নাকের নথের দিকে চেয়ে আছে রেহাংশী। ঠোঁট ভর্তি হাসতেই তিয়ার ঠোঁটের সাথে সংঘর্ষ ঘটে গোলাকার নথের। তা হাত দিয়ে একটু পরপর সরিয়ে দেয় তিয়া। তার পাশেই মেহমাদ। অফ হোয়াইট কালারের শেরওয়ানিতে তাকে আজ অন্যরকম লাগছে। গলায় পেছানো রেড আর গোল্ডেন কালারের সরু ওড়না।

রেহাংশী ভীত দৃষ্টিতে ইনজাদের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছে। ইনজাদ একহাত পকেটে গুঁজে রেখেছে। তার চোখ হাসছে। অন্য হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে রেহাংশীর হাত।নিজের অজান্তেই বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে রেহাংশীর হাতের উলটো পাশ ঘষে যাচ্ছে।রেহাংশীর আনম্র চোখে চাইল ইনজাদের দিকে। অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা, অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বে পেষিত হচ্ছে সে। ইনজাদ ছোট্ট করে হেসে বলল—

“যাও, কথা বলো ওদের সাথে।”

রেহাংশী ভাবাবেশ ছাড়া মাথা নাড়িয়ে না সম্মতি দেয়। ইনজাদ বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে বলল—

“কী হয়েছে তোমার?”

রেহাংশী উদাস গলায় বলল—

“কিছু না।”

“তাহলে? যাও, কথা বলো ওদের সাথে। তিয়ার সাথে আলাপ হয়নি তোমার তেমন। যাও, সিন্ধুজাও আছে। ”

“উঁহু।”

ইনজাদ কপাল ভাঁজ করল। রেহাংশীর হাত মুঠো থেকে আলগা করে কণ্ঠে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে বলল—

“কী হয়েছে তোমার? এমন অদ্ভুত ব্যবহার করছ কেন?”

রেহাংশী ম্লান চোখে তাকাল। নত করল মাথা। ইনজাদকে অবাক করে দিয়ে আলতো করে তার হাত আঁড়ড়ে ধরল। ইনজাদ ভড়কে গেল নীরব আশংঙ্কায়! বিচলিত গলায় বলল–

“কী হয়েছে তোমার? খারাপ লাগছে? এমন ঘামছ কেন? গরম লাগছে? গরম লাগার তো কথা নয়। এই তোমার শরীর ঠিক আছে তো?”

রেহাংশীর চাহনিতে ধ্বস নামল। একটা অবুঝ শিশুর মতো চাইল সে ইনজাদের দিকে। ইনজাদ ফের কিছু বলতে গেলেই মেহমাদ এসে দাঁড়ায়। টগবগ করে বলল–

“এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয় এদিকে। ভাবি আসুন।”

লজ্জাবতী গাছের মতো মিইয়ে গেল রেহাংশী। কিন্তু তাকে ছোঁয়ার প্রয়োজন পড়ল না। ইনজাদের চোখে-মুখে অব্যক্ত রাগের স্ফুলিঙ্গ। রেহাংশীর এহেন আচরণ একদমই বোধগম্য হচ্ছে না তার। মেহমাদ পরিস্থিতির থমথম ভাব আঁচ করতে পেরে বলল—

“কিছু হয়েছে?”

ইনজাদ নাক ফোলাল। রেহাংশীর ধরে রাখা হাতের কব্জিতে চাপ প্রয়োগ করল। শক্ত করে ধরে উঁচু পাটাতন থেকে নেমে যেতে যেতে বলল—

“তোরা থাক, আমি আসছি।”

ইনজাদ রেহাংশীকে নিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। তপ্ত মরুর বুকে হলকে উঠা তাপ ছড়িয়ে বলল—

“কী শুরু করলে তুমি? এমন করেছ কেন?”

“বাসায় যাব।”

ইনজাদ দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। তিক্ত স্বরে বলল—

“মানে কী রেহাংশী? বাসায় যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলে কেন?”

রেহাংশী জবাব দিলো না। বুকের উপরের জায়গায়াটা ক্রমশ দৃশ্যত অনুভবে উঠা-নামা করছে। ইনজাদ কণ্ঠ শিথিল করে। চোখে আনে নমনীয়তা। পেলব গলায় বলল—

“কী হয়েছে খুলে বলো? কিছু খাবে?”

“উঁহু।”

ইনজাদ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নিষ্পলক। রেহাংশীর কোনো গতিবিধি তার নজরে এলো না। নুইয়ে রাখা মাথা, স্থির কায়া। ইনজাদ গাঢ় গলায় বলল—

“আরেকটু অপেক্ষা করো। স্যারের সাথে দেখা করেই চলে যাব।”

তৎক্ষণাৎ ক্যাটক্যাটে আওয়াজে বেজে উঠল ইনজাদের মোবাইল ফোন। রিসিভ করতেই জানতে পারল সিন্ধুজার বাবা এসেছেন। ইনজাদ পকেটে রাখল মোবাইল। নির্মল গলায় বলল—

“চলো, স্যার এসেছেন।”

“আমি ওয়াশরুমে যাব।”

“এসো।”

হলরুমের একপাশে সরু করিডোর। সেখান দিয়ে ভেতরে গেলে দুইপাশে বিভক্ত একটা দেয়াল। যার এপাশে মহিলা আর অপর পাশে পুরুষদের জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা। ইনজাদ ক্ষীণ গলায় বলল—

“তুমি যাও, আমি বাইরে যাচ্ছি।”

রেহাংশী আঁতকে উঠে খপ করে ইনজাদের হাত ধরে ফেলে। ভয়চকিত কণ্ঠে অনুনয় করে বলল—

“আপনি যাবেন না।”

ইনজাদ অপ্রস্তুত গলায় বলল—

“আরে, এখান থেকে বেরিয়ে বাম দিকে গেলেই হবে। তুমি এসো।”

“না, আপনি যাবেন না। দয়া করে যাবেন না।”

“ওকে, ওকে। কোথাও যাচ্ছি না আমি। ফর গড সেক! জাস্ট রিল্যাক্স। যাও, আমি এখানেই আছি।”

রেহাংশী টলটলে চোখে চেয়ে একটু একটু করে ভেতরের দিকে এগোতে থাকে। অল্প সময় পরে ফিরে আসে।
,
,
,
স্থির হয়ে দাঁড়ায় ইনজাদ। একগাল হেসে বলল—

“হ্যালো স্যার?”

ব্যক্তিটি মেহমাদের সাথে খোশগল্পে মশগুল। ইনজাদের কণ্ঠে পেছন ফিরে। ইনজাদ সরস গলায় সালাম দিতেই তিনি প্রত্যুত্তর করেন। গাল ভর্তি হেসে বললেন—

“হ্যালো ইয়াং ম্যান! কী খবর? হাউ আর ইউ?”

ইনজাদ সরব গলায় বলল—

“আই এম ফাইন স্যার। আপনি কেমন আছেন?”

ব্যক্তিটি চমৎকার করে হাসলেন। নাকের ডগায় ভারী পাওয়ারের চশমা। সাদা রঙের পাঞ্জাবি, বৃহদাকার দেহ দেখে বুঝায় যাচ্ছে বয়সকালে সুপুরুষ ছিলেন। হেসে বললেন তিনি—

“ভালো আছি।”

“ম্যাম আসেননি?”

“এসেছে। ওই তো সৌরভের সাথে। তোমার ওয়াইফ আসেনি?”

ইনজাদ মুচকি হেসে রেহাংশীকে দেখিয়ে বলল—

“শি ইজ মাই ওয়াইফ।”

ব্যক্তিটি কেমন অবাক চোখে চাইলেন। কেন যেন তার এই ক্ষুদ্র, গোলগাল মুখটি পরিচিত মনে হচ্ছে। তিনি পলক না ফেলে তাকিয়ে রইলেন। মনে করতে চাইছেন কোথায় দেখেছেন!
ইনজাদ রেহাংশীর দিকে তাকাতেই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সঞ্চারণ হলো। অচেনা প্রৌঢ়টির বিশাল বক্ষে সজোরে এক ধাক্কা বসায় রেহাংশী। ছিটকে পড়লেন তিনি মেঝেতে। ফুঁসতে থাকল রেহাংশী। তার পদ্মদিঘীতে জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। উপস্থিত সকলের হতভম্ব দৃষ্টি। সিন্ধুজা দৌড়ে এসে বাবাকে ওঠাল। ভীত গলায় বলল—

“ড্যাড! আর ইউ ওকে?”

ব্যক্তিটি রেহাংশীর দিকে বিমূঢ়,কৌতূহলী দৃষ্টি রেখেই বলল—

“ইয়েস, আই এম ওকে।”

সিন্ধুজা দাঁড় করালো তার বাবাকে। রেহাংশীর দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

“ইউ সিলি গার্ল! হোয়াট ইজ দিস?”

ইনজাদ তেড়ে এসেই রেহাংশীর হাত ধরল। দমদমে গলায় বলল—

“এইটা কী করলে তুমি? ”

রেহাংশী বিক্ষুব্ধ গলায় বলল—

“করেছি, বেশ করেছি। একটা খুনির সাথে এমন করাই উচিত।”

ইনজাদের বিস্ময় আকাশ ছুঁল। সচকিত গলায় বলল—

“খুনি! কে খুনি?”

রেহাংশীর কণ্ঠ এবার বাতাস কাঁপিয়ে দিলো।

“ওই জিবরান খন্দকার!”

“কী?”

হলরুমের অসংখ্য নারী-পুরুষের উৎসুক নজর আবদ্ধ হলো জিবরান খন্দকারের দিকে।

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here