ষড়রিপু,১২,১৩

0
367

#ষড়রিপু,১২,১৩
#কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য
দ্বাদশ পর্ব

একচিলতে ডিভানে নিজের মোটাসোটা শরীরটা মেলে রেখে আনমনে শুয়ে আছে ডরোথি, দৃষ্টি ওয়ালড মিররের চৌহদ্দি পেরিয়ে বাইরের পরিবেশে স্থির, কপালের আঁকিবুকি কাটা দাগগুলো বহন করছে দুশ্চিন্তার প্রতিচ্ছবি,
বাংলোর এপ্রান্ত থেকে দীঘিটা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট,
টলটলে স্বচ্ছ সেই জলের দিকে তাকিয়ে ডরোথি ডুব দিলো স্মৃতির মুকুরে,

“মা,আমি বেরোচ্ছি, ফিরতে দেরী হবে বেশ,” অল্পবয়স্ক তেজস্বী মেক্সিকান যুবকটি ওভারকোট চাপাতে চাপাতে বলে ওঠে,” তোমরা পারলে খেয়ে নিও , আর চাবির এক্সট্রা সেট আমি সাথে নিয়ে যাচ্ছি,”

“সাবধানে ফিরিস বাবা, পুলিশ কিন্তু আমাদের পিছনে পড়েছে,” ফর্সা টানটান মুখে ক্রিম ঘষতে ঘষতে বলে ওঠে অল্প বয়স্কা মহিলাটি,” আর পৌঁছে ফোন করে জানিয়ে দিবি অবশ্যই, সময়টা খারাপ যাচ্ছে বড্ড…”

“হুঁ”, সংক্ষেপে জবাব দিয়ে ছেলে বেরিয়ে যেতেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডরোথি,
মাসখানেক ধরেই ওর ড্রাগের কারবারে শনির দৃষ্টি পড়েছে,
বছরভর কপস ডিপার্টমেন্টকে পেট ভরে দানা খাইয়ে রাখলেও সম্প্রতি বেশকিছু সৎ কর্মনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার আগাছার মত গজিয়ে উঠেছে,
লোভ প্রলোভন, ভয় ভীতি কিছুই যেন তাদেরকে দমাতে পারে না,
অল্পবয়স্ক হওয়ায় রক্ত বেশ গরম,
তাই টাকা দিয়ে পোষ মানানোর চেষ্টা করলেও লাভদায়ক হয়নি,
“সততার ভুত মাথায় চেপে বসেছে শালাদের,” বলে অশ্রাব্য একটা গালিগালাজ দিয়ে উঠলো ডরোথি,
” এরকম আরো কয়েকটা গজালে ব্যবসাপাতি গোটাতে হবে নিশ্চিত,”

“ম্যাডাম আমি আসবো?” হাসিমুখে অভিবাদন জানিয়ে বলে উঠলো কর্মচারীটি “আমাদের প্যাকিং রেডি হয়ে গিয়েছে, এখন আপনি সিগনেচার করে দিলেই কমপ্লিট,”

“যাও ,আমি আসছি ,” বলে হাতটা নাড়িয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলে ওঠে ডরোথি,” তারপর আধখোলা সোনালী চুলে চিরুনি বোলাতে থাকে দ্রুতহাতে,
আজ টোটাল দশটা পেটি সাপ্লাইয়ের এগ্রিমেন্ট আছে ডরোথির, এরপর সেগুলোই হাতবদল হয়ে চলে যাবে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে এবং এশিয়ান কান্ট্রি গুলোতে,
ইদানিং এশিয়ান কান্ট্রিতে ড্রাগের চাহিদা বেড়ে গেছে ব্যাপকহারে… উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ফ্যামিলির অল্পবয়স্ক যুবক-যুবতীরা হিরোইনের অমোঘ নেশাতে মজেছে,
বাপ-মায়ের কাঁচা পয়সা ধোয়ার টানে উড়িয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে সবগুলো,
অনেক সময় বাজার এতটাই বেশি থাকে যে ,সাপ্লাই দিয়েও চাহিদা মেটানো যায়না..
তখন বাধ্য হয়ে আসল মালের সাথে কিছুটা ভেজাল মিশাতে হয়,
পোড়-খাওয়া নেশাড়ুদের চোখে অবশ্য ধুলো দেওয়া যায়না, তাই ভেজাল মালগুলো বিক্রি করা হয় সদ্য উড়তে শেখা বড়লোকের বখাটে ছেলে মেয়েগুলোকে,

চুল আঁচড়ানো শেষ করে আঁটো করে পনিটেল বেঁধে নিল ডরোথি, তারপর দুধে-আলতা ত্বকে হালকা পাউডারের প্রলেপ বুলিয়ে দিল খানিকটা,

” আরে তুমি এখনো সেজে যাচ্ছ !” খানিকটা ঝেঁজিয়ে বলা কথাগুলো কানে ভেসে আসতেই ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকাল ডরোথি,
” কাম অন , লেবাররা সব ওয়েট করছে,”

“হয়ে গিয়েছে ,”বলে কপালের সামনে ফ্রিঞ্জড চুলগুলো সরিয়ে দিল ডরোথি, তারপর কোটটাই পরা সুদর্শন মধ্যবয়স্ক পুরুষটির হাত ধরে এগোতে লাগল সামনের দিকে,
“তোমাকে ব্ল্যাক ড্রেসে অসামান্য লাগে ডরোথি , মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে দেবী আফ্রোদিতি নেমে এসেছে,” কপালে হালকা চুমু পরশ বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন মিস্টার মারিয়া, সম্পর্কে যিনি ডরোথির স্বামী ,
“এবার থেকে হালকা রঙের পোশাকগুলো ছেড়ে গাঢ় রং ট্রাই করবে ,অতটাও বুড়িয়ে যাওনি তুমি,”,

মৃদু হেসে মোড়টা পেরোতেই সেই কর্মচারীটি ছুটে আসলো উদভ্রান্তের মত , লালচে মুখো রেড ইন্ডিয়ান উত্তেজনার ছুটে আসার জন্য আরো লালচে হয়ে গিয়েছে,” ম্যাডাম পুলিশ,”হাঁপাতে হাঁপাতে শব্দদুটো বলে উঠলো কোনক্রমে ,
“প্যাকিং বাক্সগুলো এখনো বাইরে পড়ে আছে,

“হোয়াট দা…” স্বামীর হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে পাগলের মত জানলার দিকে ছুট লাগালো ডরোথি, বিশাল দিঘির উল্টোদিকে ঘেসো জমি দিয়ে ইউনিফর্ম পরা পাঁচ সাতজনের ছোটো দলটা দ্রুতপদে এগিয়ে আসছে এদিকেই!

সেদিকে তাকিয়েই শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোতটা দিব্যি টের পেল ডরোথি,
ভয় উৎকন্ঠায় হালকা-পাতলা মুখটা ঘেমে গিয়েছে ততক্ষণে,

” মিস্টার হার্নান্ডেজ, এই মুহূর্তে সবকটা বাক্স সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিন,” নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠে ডরোথি,” সমস্ত লেবারদের বলুন ব্যাকডোর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে ,কুইক এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করবেন না!”

” ওক্কে ম্যাডাম ,”নির্দেশ পাওয়া মাত্র জ্যা মুক্ত তীরের মতো ছুট লাগালেন মিস্টার হার্নান্ডেজ,

” আর শোনো তুমি ভয় পেওনা , আমি আছি,
স্বামীকে আশ্বস্ত করতে বলে উঠলো ডরথি,
” চলো গিয়ে বাইরের ড্রইং রুমে বসা যাক!

বলে স্বামীর হাতটা ধরে টানতে টানতে ডরোথি এগিয়ে চলল ড্রইংরুমের দিকে, উত্তেজনার আবেশে ওর সুন্দর করে বাঁধা চুল খুলে গিয়েছে, মুখের পাউডার ঘামে গলে গিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে,

তড়িতগতিতে ড্রইং রুমে গিয়ে টিভিটা অন করে দিল ডরোথি, তারপর টেবিলে রাখা ওয়াইনের বোতলটা খুলে ফেলল অভ্যস্ত হাতে,

এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠতেই ধক করে উঠলো ঘরে উপস্থিত দুজনের বুক,
মিস্টার হার্নান্ডেজ ফিরে এসেছেন ততক্ষণে,
লালমুখো রেড ইন্ডিয়ান এর দিকে তাকিয়ে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ডরোথি,
মুখের অভিব্যক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে পেটি গুলো ইতিমধ্যে অন্যত্র সরে গিয়েছে,

অধৈর্যের মত কলিং বেলটা বেজে উঠল আবারো,

“নমস্কার ম্যাডাম, আশা করি চিনতে পারছেন, ভিতরে ঢুকতে পারি ?” বলে উত্তর অপেক্ষা না করেই গটগট পায়ে ড্রইং রুমে ঢুকে আসলেন তরুণ সেই পুলিশ অফিসার, পিছনে পিছনে আরো চারজন,

“কোথাও বের হচ্ছিলেন নাকি! এত সাজগোজ?”
কৌতুক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে উঠলেন পিছনের আরেকজন অফিসার,” নাকি বাড়ি থেকে পালাবার প্ল্যান কষছিলেন ম্যাডাম?”

“ইয়ার্কিটা কিন্তু আপনি বেশ করেন , কিন্তু হাসি পেল না” কণ্ঠস্বরে শ্লেষ মিশিয়ে বলে উঠলো ডরোথি,” কোথাও বের হচ্ছিলাম বলেই তো সাজগোজের প্রয়োজনীয়তা পড়েছিল,” হালকা হেসে ফের বলে ওঠে ডরোথি,

“আচ্ছা?” কথার পিঠে ফের বলে ওঠেন তরুণ অফিসার ,” বের হওয়ার আগে বুঝি গলায় তরল ঢালেন ? নাকি ড্রাংক হয়ে গাড়ি চালাতে ভালো লাগে, কোনটা?” হাসতে হাসতে ওয়াইনের বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে বলে উঠলেন অফিসার,” বাহ বেশ দামী দেখছি !তা ম্যাডাম কারখানা থেকে কত আয় হয় আপনার?”

“সেটা তো আমি সরকারকে বলবো , আপনাকে নয় ,”এতক্ষণ পর মুখ ফুটে বলে ওঠেন মিস্টার মারিয়া,” আর আপনাদের আগমনের কারণটা জানতে পারি ?”

“অ্যাবসোলিউটলি !হোয়াই নট,” বলে হেসে ওঠেন সে পুলিশ অফিসার,
“কারণ ছাড়া এদিক ওদিকে ঘুরে বেড়ালে উপরওয়ালাকে জবাবদিহি করতে হয় যে !”

“তাহলে বলেই ফেলুন,” গলায় শ্লেষ মিশিয়ে ফের বলে ওঠে ডরোথি,

“আপনাদের ঘরটা সার্চ করতে হবে ম্যাডাম ,আর হ্যাঁ ওয়ারেন্ট আমরা সাথেই এনেছি,” ডরোথির চোখে চোখ রেখে বলে ওঠেন পুলিশ অফিসার “তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পরো কুইক !”

“এসব কি হচ্ছে!” খানিক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে উঠতেই ধমকে ওঠে পুলিশ অফিসার ,”আমাদের কাছে খবর আছে অবৈধভাবে হেরোইন তৈরি হচ্ছে এখানে, আর সেটা সরকারের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে,” কেটে কেটে বলে ওঠেন অফিসার ,” আগের ইনচার্জের চোখে ধুলো দিতে পারলেও আমার কাছে সেটা সম্ভব নয় ম্যাডাম,”
হাসিমুখটা বজায় রেখে ফের বলে ওঠেন তিনি “আপনি শান্ত হয়ে বসুন , ততক্ষনে আমরা গল্প করি কেমন ? আচ্ছা আপনার নেকলেসটার দাম কত ?”বলে আঙ্গুল উঁচিয়ে নির্দিষ্ট করে গলার দিকে,”

উত্তর না দিয়ে ইস্পাত কঠিন মুখটা ডরোথি ঘুরিয়ে রাখে অন্যদিকে,

আধঘন্টা এভাবেই কেটে যায় ,অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চাইছে না… প্রতিটা সেকেন্ডকে এক ঘন্টার সমান দীর্ঘ মনে হচ্ছে,

“স্যার কিছু পেলাম না, কিছুনা!” হতাশার ভঙ্গিতে ফিরে আসা পুলিশ অফিসারগুলো বলে উঠেছে ততক্ষনে ,”আমার মনে হয়…”

“ইসস , তবে আমরাই হয়তো ভুল করে ফেললাম,”
অধঃস্তন অফিসারকে থামিয়ে বলে উঠলেন ইনভেস্টিগেটর,
” আচ্ছা ম্যাডাম , আজ আসি , দেখা হবে খুব শিগগির ,”বলে নমস্কার জানিয়ে দ্রুতপদে বাইরে গেলেন অফিসার

সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো ডরথি,
কিন্তু ঘটনাক্রম যে আরো সুদুরপ্রসারী সেটা কে জানত !

#ষড়রিপু ( ত্রয়োদশ পর্ব )
#কঠোরভাবে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য
“এই শুনছো ওঠো শিগগির,” সচকিত নারী কন্ঠস্বরটি বারকয়েক ডেকে উঠলেও কোন সাড়াশব্দ পেলনা, অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে কোনমতে বেডসুইচ খুঁজে চললেও নাগালের বাইরেই থেকে গেল, অতঃপর বাধ্য হয়ে পাশে শায়িত প্রৌঢ় ভদ্রলোককে ধাক্কা দিল একবার,
বিষম সেই ধাক্কার চোটে মৃদু নাসিকাগর্জন থেমে যায় এবার,
” কি হলো !কি হলো !” হতচকিত ভয়ার্ত স্বরে পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই অন্ধকারে তার মুখ চেপে ধরে নারীদেহটি, তারপর ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,” কেমন একটা শব্দ আসছে বাইরের করিডোর থেকে, জাস্ট কিপ সাইলেন্স অ্যান্ড লিসন,”
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা অবশ্য, মুহূর্তখানেক পরেই মৃদু খসখস শব্দটা বেশ জোরালোভাবে ধাক্কা মারলো মিস্টার মারিয়ার কর্ণপটহে, কোন ভারী জিনিস ঘষটানোর আওয়াজ ঘরের মধ্যে থেকেও শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট,
আশঙ্কার চোরাস্রোতে মনটা কেমন দুলে উঠলো মিস্টার মারিয়ার,

“তুমি এখানে বসে থাকো, ডরোথি, আমি দেখছি ব্যাপারটা কি ,”ফিসফিসিয়ে বলে উঠতেই দৃষ্টি চলে গেল পাশের জানলার দিকে, মোটা পর্দাটা সামান্য ফাঁকা করে শ্যেনদৃষ্টিতে ডরোথি চেয়ে আছে বাইরের দিকে,
“নাহ্, বাইরে কেউ নেই,”বলতে বলতে ডরোথি
পলক ফেলার আগেই তড়িৎগতিতে ফিরে আসে স্বামীর কাছে,
মৃদু আলোতে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলে মিস্টার মারিয়াকে, তারপর বেডসাইডে ফেলে রাখা গরম জামাটা রাত পোশাকের উপর চাপিয়ে দ্রুত হাতে, কোনের ড্রয়ারটা খুলে ধাতব শীতল নলাকার বস্তুটাকে সন্তর্পণে পুরে নিল হাতের মুঠোর মধ্যে,
” একি ! তুমি কোথায় যাচ্ছ?” স্ত্রীকে পায়ে-পায়ে বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখেই প্রশ্ন করে ওঠে মিস্টার মারিয়া, বুকটা ধ্বক করে উঠলো ভীষণভাবে,
ওকে নিরস্ত করতে চেষ্টা করলেও লাভ হলো না কিছুই, কারন ডরোথি ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে কাঠের শক্ত আগলটার কাছে,

“ক্যাচ ” মৃদু শব্দ করে ভারী পাল্লাটা খুলে গেল খানিকটা,
সতর্ক ভঙ্গিতে সরু শীতল নজর ফাঁকা জায়গায় রাখতেই এক ঝটকা খেলো ডরোথি, স্যুটেড-বুটেড চারজনের দলটা এগিয়ে আসছে এদিকেই,

ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে স্ত্রীয়ের খোলা বাহুতে নিজের পাঞ্জাটা রাখতেই একঝটকা মেরে হাতটা ফেলে দিলো ডরোথি, তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে সর্বশক্তি দিয়ে কাঠের পাল্লাটা খুলে বন্দুকটা ওদের দিকে তাক করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো “হ্যান্ডস আপ” !

স্ত্রীয়ের এমন দুঃসাহসীকতায় এক্কেবারে থ হয়ে গেলেন মিস্টার মারিয়া,
চারজনের চলমান দলটা থমকে গিয়েছে ততক্ষনে, কোনের ড্রয়ারটা থেকে নিজের লাইসেন্সড পিস্তলটা মিস্টার মারিয়াও মুঠোবন্দী করে নিয়েছেন,
“কারা তোমরা? বাংলোর ভিতরে ঢুকলে কেমন করে!” জিঘাংসা ভরে প্রশ্ন করে উঠলো ডরোথি,
ওর চোখ দুটো থেকে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন,
” কারা তোমরা !”
কোনো জবাব না পেয়ে ডরোথি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে,
স্ত্রীয়ের কার্যকলাপ দুচোখ ভরে গিলছে মিস্টার মারিয়া, পা দুটো মেঝের সাথে সেঁটে গিয়েছে চুম্বকের মত,
“খুব সাহস দেখছি, এক্কেবারে সিংহের গুহাতে ঢুকে পড়েছ!” চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে ডরোথি, শকুনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ততক্ষণে মেপে নিচ্ছে চারজনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রত্যেকটা নড়াচড়া,”সিংহের গুহায় যখন ঢুকেছ নিশ্চয়ই খালি হাতে আসোনি, কোথায় তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র! শিগগির এদিকে দাও নইলে কিন্তু আমি ট্রিগার চালাতে দুই মুহূর্ত ভাববোনা,”
“আমাদের কাছে কিছু নেই,” জবাব দেওয়ার সাথে সাথে বন্দুকের বাট দিয়ে একজনের মুখে আঘাত করলো তারপর ক্ষিপ্র গতিতে গুলি চালিয়ে দিল একজনের পায়ে,

“বাবাগো!” আর্তনাদে করে একজন চিল্লিয়ে উঠতেই ডরোথি হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,” ফুল লোডেড গান আর সাইলেন্সার লাগানো, আশা করি পরের টার্গেট তোমরা হতে চাও না,
খুন করে সামনের দীঘিতে ফেলে দেবো কাকপক্ষীও কিন্তু টের পাবে না!”
ওর হুমকিতে কাজ হল,
অবস্থা বেগতিক দেখে বাদবাকি তিন জন মুখ চাওয়াচায়ী করে উঠলো, সেদিকে তাকিয়ে বলে ডরোথি ফের বলে উঠলো,”ভাবার জন্য অনন্ত সময় দিয়ে বসিনি, বলে ফের আর একটা গুলি চালাল মেঝেতে লক্ষ্য করে,
মৃদু শব্দ করে পুড়ে যাওয়া গোল দাগটা ফুটে উঠতেই একজন বলে উঠল ,”কোথায় যেতে হবে চলুন,”
“এইতো গুডবয়, আশাকরি মেঝেটার মত ফুটোফাটা বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে বাঁচতে চাও না তোমরা,”
উপায় না দেখে তিনজনের দলটা মাথায় হাত রেখে পায়ে পায়ে এগোতে থাকলো বেডরুমের দিকে,
পায়ে গুলি লাগা লোকটা মেঝেতে হামাগুড়ি দিতে দিতে তাদের পিছু পিছু এগোতে লাগল কোনক্রমে,

“তোরা টোটাল কতজন, আর বাংলোর ভিতর ঢুকলি কিভাবে!” একজনের মাথায় ফের বন্দুকের নল ঠেকিয়ে প্রশ্ন করে উঠলো ডরোথি,

প্রত্যুত্তরে কিছুনা বলে লোকটা হাসতে লাগল মিটিমিটি , ওর হাসির অর্থ বুঝতে না পেরে ডরথির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল,
তারপর নীরবতা ভেঙে বলে উঠলো লোকটা,” যাও
খোঁজো গিয়ে , সব সর্বনাশ হতে চলেছে তোমার,
আমাদের প্রাণে মেরে ফেললেও লাভ হবেনা!”

“তুমি এখানে ওদের সাথে সময় নষ্ট কোরোনা! শিগগির কারখানার দিকে চলো, আমার মনটা কেমন কুডাক গাইছে, তাছাড়া পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখা হয়নি!”
স্বামীর কথা শুনে প্রস্তাবটা মনঃপূত হল ডরোথির। আজ সকালেই পুলিশের হানা , উপরন্তু অপরিচিত চারজনের বাংলাতে ঢুকে পড়া ….ব্যাপারটার মধ্যে কোন যোগসূত্র থাকতে পারে বৈকি,

“তোরা এখানেই থাকবি, কোনরকম চিল্লামিল্লি আওয়াজ করে লাভ হবে না! ঘরটা সাউন্ড প্রুফ না হলেও গোটা বাংলোটাই দিঘির জন্য সাউন্ডপ্রুফ হয়ে গেছে, বাইরে থেকে কোনভাবেই আওয়াজ শুনতে পারবে না কেউ, সুতরাং শান্ত ছেলের মতো চুপচাপ বসে থাকাটাই মঙ্গল,” নির্দেশ দিয়ে মোটা কাঠের দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল ডরোথি,

“চলো এবার ছেলের ঘরে যাওয়া যাক ,প্রচণ্ড ভয় করছে আমার, ওর যদি কিছু যায় এদের একটাকেও ছাড়বো না আমি! কেটে ভাসিয়ে দেবো দিঘির জলে,” বলে স্বামীর হাতটা ধরে টানতে টানতে এগোতে লাগলো করিডোর দিয়ে, মোড় ঘুরেই একমাত্র ছেলের ঘর,

“কিন্তু এরা ঘরে ঢুকলো কি করে !” আশঙ্কার চোরা বুদবুদ কিছুতেই মিলিয়ে যাচ্ছেনা যে, চাবি তো একমাত্র তিন জনের কাছেই থাকে… ছেলে ডেভিড ,স্বামী এবং ডরোথি কাছে, “তবে কি আজ ডেভিড চাবিটা কোথাও ভুলে ফেলে এসেছে “আপন মনেই বলে উঠলো ডরোথি ,

“একি! ডেভিড কোথায়!” সুবিশাল কারুকার্যময় দরজার পাল্লাটা খোলামাত্র আর্তনাদ করে উঠলেন মিস্টার মারিয়া,

গোটা ঘরটা খাঁ খাঁ করছে , বিছানার চাদরটা কুচকে আছে, যেন কিছুক্ষণ আগেই এখানে বসেছিল কেউ…
“কোথায় আমার ছেলে!” এলোমেলো সাদা চাদরটাকে খামচে ধরে প্রায় কেঁদে ওঠে ডরোথি,

“বাথরুমেও নেই, লিভিং রুম ডাইনিং কিচেনে
কোত্থাও নেই!” বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন মিস্টার মারিয়া, সম্ভাব্য সব জায়গাগুলো ততক্ষনে খুঁজে বিফল মনোরথে ফিরে এসেছেন তিনি,

এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গিটার , সাউন্ড বক্স সিস্টেম, জিমের ইন্সট্রুমেন্ট মেটেরিয়াল…কিন্তু একমাত্র ছেলে ডেভিডের কোন হদিস নেই,
ছেলেকে নিরুদ্দেশ দেখে চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল মেক্সিকো সিটির উদীয়মান ড্রাগ মাফিয়া মিসেস ডরোথি মারিয়ার চোখের কোল বেয়ে,
“তবে কি ওরা ডেভিডকে কোথাও আটকে রেখেছে ! নাকি খুন করে দিয়েছে ,” ভাবনাটা মাথায় আসতেই কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল ডরোথি, দুশ্চিন্তায় মাথাটা ততক্ষণে তালগোল পেকে গিয়েছে তা বলাই বাহুল্য,
মাঝরাত্রে একি উপদ্রব!

“চলো একবার কারখানার দিকে ঘুরে আসা যাক,”
স্ত্রীকে মেঝে থেকে উঠাতে উঠাতে সান্তনার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন মিস্টার মারিয়া,” এমনও তো হতে পারে ওখানে নিয়ে গেছে ওকে , পুরো বাড়িটা তো খুঁজে দেখাই হলো না, এত ভেঙে পড়লে চলে নাকি ,”স্ত্রীয়ের মনের জোর বাড়াতে বলে উঠলেন তিনি,
স্বামীর কথাটা মনে ধরল ডরোথির ,তারপর হাতে রাখা বন্দুকটা শক্ত করে ধরে এগোতে লাগল সামনের দিকে,

“নিজের পেটের ছেলে হয়ে তুই এমন ভাবে সর্বনাশ করতে পারলি !” হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে বয়সের ছাপ পড়তে থাকা মহিলাটি গর্জে উঠলেন,
ক্রোধে হতাশায় মুখে ফেনা উঠে গিয়েছে ততক্ষণে,
চোখের সামনে সাজানো স্বপ্নটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে যেন কেউ,
একমাত্র ছেলেকেই তো গোটা সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার বানানোর পরিকল্পনা ছকে রেখেছিলেন মনে মনে,
” আমাদের অবর্তমানে তুই’ই তো সমস্ত পয়সাকড়ির মালিক হতিস!” রাগে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বলে চলেছে ডরোথি,”

” তোমাদের পাপের পয়সা নিয়ে আমি ভাগীদার বাড়াতে চাই না মা! অর্থ সম্পদের লোভে এতটা নিচে নেমে গিয়েছো যে নিজের দেশের যুবসমাজের ক্ষতি করতেও তোমাদের আটকায় না!”
রাগে ঘৃণায় মুখটা কুঁচকিয়ে বলে চলেছে ডরোথির একমাত্র ছেলে,” পাপের পয়সা আমার হজম হবেনা মা , তাই পুলিশকে ডাকার পরিকল্পনা আমারই ছিল, আমি চারজনের হাতে বাড়ির চাবি তুলে দিয়েছি!” গর্বিত ভঙ্গিতে বলে ওঠে ফের,

ততক্ষনে আটকে পড়া চারজন স্পেশাল ফোর্স মুক্ত হয়ে ডেভিডের পিছনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে,
সেদিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলে ওঠে মিস্টার মারিয়া,” কারবারে কখনো সম্পর্কের দুর্বলতায় গলে যাওয়া ঠিক না !” বলার পরক্ষনেই লোডেড পিস্তল থেকে একটা গুলি এসে ছিটকে লাগে দলের একজনের বুকে,
পলক ফেলার আগেই আর একজনকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালিয়ে দেন মিস্টার মারিয়া!

“এই ডরোথি কি হয়েছে! এভাবে কাদছো কেন!”
মোটাসোটা শরীরটা ঝাকাতে ঝাকাতে বর্তমান সময়ে বলে ওঠে রিক্ত,” কি হয়েছে তোমার! আর এত্ত ড্রিঙ্কস করে কেউ! এবার তো অ্যালকোহল টক্সিসিটি হয়ে যাবে!” খালি কাচের বোতলটা এখানে ডিভানের নিচে রেখে বলে ওঠে রিক্ত
” ফর গড সেক, বলো কি হয়েছে,”

“আমার ছেলের কথা জানতে চাইছিলেনা রিক্ত?” ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে ওঠে ডরোথি,” নিজে হাতে কেটে ওকে ভাসিয়ে দিয়েছি দিঘির জলে,”

শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া ঠান্ডা স্রোতটা স্পষ্ট টের পেলো রিক্ত, একি নৃশংস!
” মানে !” প্রায় আর্তনাদ করে উঠলো রিক্ত,
” নিজের ছেলেকে !”

” স্বামী হন্তাকে কিভাবে ছেড়ে দেই ! ও যে নিজের বাবাকেও খুন করে দিয়েছিল, সততার ভুত চেপে বসেছিল মাথার মধ্যে,” কাঁদতে কাঁদতে ফের বলে ওঠে ডরোথি,” মেক্সিকান কপ ডিপার্টমেন্টের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে ছারখার করে দিতে চেয়েছিল তিলে তিলে গড়ে তোলা আমার কারবারকে!”

নিজের জীবনের সাথে অদ্ভুত মিল পেয়ে আর কিছু বলতে পারলোনা রিক্ত,
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পুরুষালী হাতটা রাখল ডরোথির সোনালী চুলের উপরে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here