সেই তুমি? পর্ব -৯

0
3186

সেই তুমি?
পর্ব -৯
Samira Afrin Samia(nipa)

ইশিতা নিজের সামলে নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হয়ে আসলো। ইফান ইশিতার বাসার সামনে ইশিতা কে না পেয়ে ভার্সিটিতে চলে আসলো। ভার্সিটি এসে রাফির সাথে দেখা হয়ে গেল।
— রাফি ইশিতা কে দেখছিস? ওকে আজ বাসায় নিয়ে যাবো।মায়ের সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিব।
— ইফান তুই কি সত্যি ই ইশিতা কে বিয়ে করবি?
— বিয়ে করার জন্য ই ভালোবেসেছি। কেন তোর বিশ্বাস হয় না আমি যে ইশিতা কে ভালোবাসি।
— না, তা না পরেও। তুই তো আগে কখনও
— আগের কথা বাদ দে দোস্ত আমি সত্যি ই ইশিতা কে ভালোবাসি। এখন চল দেখি ইশিতা কোথায়।
ইফান ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ইশিতা কে খুঁজে যাচ্ছে। ইফান ইশিতা কে দেখার সাথে সাথে দৌঁড়ে ইশিতার কাছে চলে আসে।
— ইশিতা তুমি এখানে। আমি তোমাকে কত জায়গায় খুঁজেছি। তোমার মনে নেই আজ আমাদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল।
ইশিতা কিছু না বলে চলে আসছিল। ইফান পেছন থেকে ইশিতার হাত ধরে
— কি হলো কথা না বলে এভাবে চলে যাচ্ছো যে।
ইশিতা পেছনে ঘুরে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে সবার সামনে ইফানের গালে থাপ্পড় মারে। ইশিতার এমন কান্ড দেখে পুরো ক্যাম্পাসের সবাই থমকে দাঁড়িয়ে যায়।কেউ কিছু বুঝতে পারছে না ইশিতা হঠাৎ করে ইফান কে থাপ্পড় মারলো কেন। ইফান ও কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে ইশিতার কি হলো।
— ইশিতা তুমি আমাকে চড় মারলে?
ইশিতা ইফানের র্শাটের কলার ধরে
— একটা কথা ও বলবি না তুই। আমার সাথে তুই এতো দিন ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয় করে গেছিস। আমার মত এভাবে আর কত মেয়েকে বোকা বানিয়ে তোর প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছিস।
— কি বলছো এসব তুমি?
— বুঝতে পারছিস না কি বলছি? তুই আমাকে কখনও ভালোবাসিস নি। তাহলে কেন শুধু শুধু আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করেছিস।
আসলে তোকে চিনতে আমার ভুল হয়ে গেছে। তোর মত ছেলেরা আর যাই করুক কাউকে ভালোবাসতে পারে না। তোদের ভালোবাসা শুধু বেড রুমে পর্যন্ত ই সীমাবদ্ধ।
— ইশিতা তোমার মাথা ঠিক আছে তো। কি এসব উল্টো পাল্টা কথা বলছো
— একদম আমার নাম তোর মুখে নিবি না। তোর মত ক্যারেক্টারলেস ছেলেকে আমি আমার ধারের কাছে ও ঘেঁষতে দেই না। তুই মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওদেরকে ওর সাথে বেডরুম পর্যন্ত নিয়ে যাস।
ইফান রেগে গিয়ে ওর র্শাটের কলার থেকে ইশিতার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে
— তুমি কি বলছো তা ভেবে বলছো তো? আমি কোন মেয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছি। আমি এর আগে কোন মেয়ের সাথে ভালো করে কথা ও বলিনি।
— আর কত মিথ্যে বলবি তুই। তুই রিহার
ইশিতা বলতে গিয়েও থেমে গেল। এখন ইফানের সামনে রিহার কথা বলে দিলে ইফান কখনও রিহা কে মেনে নিবে না। রিহা ইফান কে না পেলে মারা যাবে। আর সবার সামনে রিহার দেখানো ছবি গুলোর কথা বললে রিহার ই সন্মান নষ্ট হবে। ইশিতা মেয়ে হয়ে জেনে শুনে অন্য একটা মেয়ের সর্বনাশ করতে পারবে না।
— কি হলো বলো রিহা কি বলেছে তোমাকে?
— রিহা কিছু বলেনি। আমার যা বুঝার দরকার ছিল আমি তা বুঝে নিয়েছি। তোর মত একটা বাজে ছেলের সাথে আমি রিলেশন রাখতে চাই না। তুই কখনও কাউকে ভালোবাসিস না। কেউ তোর আসল রূপটা দেখতে না পেলেও আমি খুব ভালো করেই তোর আসল রূপ দেখে নিয়েছি।
ইশিতা ইফান কে কথা গুলো বলে এক দৌঁড়ে ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গেল। এখানে দাঁড়ানো সবাই ইফানের দিকে তাকিয়ে হাসছে। যে ইফানের কথায় সবাই উঠতো বসতো আজ সেই ইফান কে দেখেই সবাই মুখ টিপে হাসছে। ইশিতা এসব কেন করলো ইফান কিছুই বুঝতে পারছে না। সবার সামনে এই অপমান ইফান সহ্য করতে পারছে না। কোন দোষে ইশিতা ইফানের গালে থাপ্পড় মেরেছে তা ইফান নিজেও জানে না। ইশিতা কে ভালোবেসে কি এমন ভুল করেছে যার জন্য ইশিতা এভাবে সবার সামনে তাকে অপমান করলো। আজকের এই অপমানের পর ইফান আর ইশিতা কে ভালোবাসতে পারবে না। আজকের ঘটনার পর ইশিতার প্রতি ভালোবাসা গুলো ঘৃণা আর প্রতিশোধের রূপ নিয়েছে। ইফান এতো দিন ইশিতা কে যতটা ভালোবাসা দিয়েছে আজকের পর থেকে ঠিক ততটা কষ্ট দিবে। এই অপমানের বদলা এক এক করে শোধ দিবে ইশিতা কে। রাফি ইফান কে নিয়ে ওদের বাসায় চলে যায়।

রাতে ইফান অনেক ড্রিঙ্ক করে। আগেও ইফান ড্রিঙ্ক করতো কিন্তু আজকের মত আর কখনও ড্রিঙ্ক করে নি। রাফি ইফান কে একা সামলাতে না পেরে রিহা কে কল করে ওর বাসায় আনে।
— রিহা তুই কি বলেছিস ইশিতা কে যার জন্য ইশিতা এভাবে ইফান কে সবার সামনে অপমান করলো।
— ওসব জেনে তোর কাজ নেই। তুই শুধু আজকের পর থেকে কখনও ইফান কে ইশিতার সাথে একা ছাড়বি না।
রিহা ইফান কে ধরে দাঁড় করাতে নিলে ইফান নিচে পড়ে যায়। রিহা নিচে বসে ইফানের মাথা ওর কোলে রেখে
— ইফান আর কত ড্রিঙ্ক করবে? একটা মেয়ের জন্য তুমি এমন করছো কেন?
ইফান নেশা করা অবস্থায় ভালো করে কথা বলতে পারছে না।
— আমি ওকে সত্যি সত্যিই ভালোবেসে ছিলাম। ওর আমার ভালোবাসার দাম না দিয়ে আমাকে আর আমার ভালোবাসা কে অপমান করেছে। সবার সামনে ও আমার গালে থাপ্পড় মেরেছে। আমি কি অন্যায় করেছি? আমি ওর সাথে কখনও খারাপ ভাবে কথা ও বলিনি। আর ও আমাকে সবার সামনে অপমান করলো। আমি ওকে বেড রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালোবাসিনি। আমি তো আজ ওকে আমার বাসায় নিয়ে গিয়ে আমার মায়ের সাথে দেখা করিয়ে আমাদের বিয়ের কথা বলতে চাইছিলাম। ও কেন আমার সাথে এমন করলো। ও কি আমাকে ভালোবাসতো না?
কথা গুলো বলার সময় ইফানের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
— ইফান ওই মেয়েটা তোমার যোগ্য নয়। ওদের মত ছোট লোকেরা এভাবেই ছেলের ফাঁসায়। ওরা এভাবে সিন ক্রিয়েট করে সবার নজরে বড় হতে চায়। আমি তোমাকে ওই মেয়েটার জন্য কষ্ট পেতে দিব না। ও তোমাকে সবার সামনে অপমান করেছে। তুমি সেই অপমানের প্রতিশোধ অবশ্যই নিবে। আমি আছি তো তোমার পাশে।

ইফান হাত তালি দিচ্ছে আর হাসছে
— মনে পড়ছে ওই দিনের কথা গুলো। তুই আমাকে ওই দিন ওভাবে অপমান করার পর থেকেই আমি তোকে ঘৃণা করি। তুই ভাবলি কি করে তোর এতো অপমান সহ্য করেও আমি তোকে ভালোবাসবো। সেদিন আমার কোনো দোষ ছাড়াই তুই আমাকে অপমান করেছিলি। সবার সামনে আমাকে ছোট করেছিস।
ওই দিনের ঘটনার পরে আমি কেন তোর সাথে ব্রেকআপ করিনি। কেন আবার তোর কাছে গেছিলাম। কেন তোর সাথে আবার সব কিছু ঠিক করেছিলাম ওটা তুই বুঝতে পারিস নি। সব ছিল আমার প্লেন। তোর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি তোর সাথে নরমাল বিহেইভ করেছি। যাতে তুই আমাকে আবার বিশ্বাস করিস। আমি তোর ওই বিশ্বাসের সুযোগে নিতে চাইছিলাম। তুই বলেছিলি না আমার ভালোবাসা বেড রুম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আমি শুধু বেড রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালোবাসি। তাই তোর কথা অনুযায়ী তোকে ও বেড রুমে নিয়ে গেছি। এখন তোর সাথে আমার কোনো রিলেশন নেই। তুই আমাকে ক্যারেক্টারলেস বলেছিলি তাই না?
তাহলে তুই আজ কি? তোকে লোকে কি বলবে একবার ভেবে দেখ?
— তাহলে ওই দিনের সে ঘটনার পর থেকে আমার সাথে যা যা করেছো সব মিথ্যে নাটক ছিল। সব তোমার প্লেন ছিল?
— হ্যা। ওই ঘটনার আগে আমি সত্যি ই তোকে ভালোবাসতাম। কিন্তু ওই দিন ওই ঘটনার পর থেকে সব আমার প্লেন ছিল। যে প্লেনে রিহা আর রাফি ও যুক্ত ছিল। ওই দিন রিহার বাসায় পার্টির প্লেন রিহার ছিল। ওই প্লেনের জন্য ই তো আমার প্রতিশোধ পূর্ণ হলো।
— রিহা ও?
— হুম। রিহা ই তো তোর জোসে নেশার ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিল।

ইশিতা কখন স্পষ্ট বুঝে গেছে এসব কিছুর পেছনে রিহার হাত। রিহা ইচ্ছে করে প্রথমে ওর কাছে ইফানের নামে মিথ্যে বলে ওদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করেছে। আর এখন ইফান কে ইশিতার বিরুদ্ধে নানা কথা বলে ইশিতার সম্পর্কে ভুল ধারনা তৈরি করেছে। সব কিছুর আসল অপরাধী রিহা। ইফান সত্যি টা না জেনেই ইশিতার সাথে এসব করছে ওই দিনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। ইফান নিজেও সত্যি টা জেনে একদিন ঠিকই কষ্ট পারে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে।

— ইফান তুমি আমার কথা গুলো বুঝার চেষ্টা করো রিহা এসব কিছু
ইশিতা কথা শেষ করার আগেই রিহা ইশাকে একটা চড় মেরে নিচে ফেলে দেয়।
— তোর মত মেয়ের মুখে আমার নাম নিবি না।
ইশিতা নিচে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইফানের সামনে গিয়ে
— ইফান প্লিজ ঠান্ডা মাথায় আমার কথা শুনো ওই দিন যা হয়েছে তা রিহা
ইফান ইশিতার কোন কথায় কান দিচ্ছে না
— কি শুনবো তোর কথা। তোর মত মেয়ে কি আর বলবি। যে মেয়ে বিয়ের আগেই একটা ছেলের সাথে বেড রুম পর্যন্ত যেতে পারে তাকে আমার পহ্মে বিয়ে করা সম্ভব না। অবশ্য আমার প্লেন ই ছিল তোর নামে বদনাম করা তোর মুখে চুনকালি মাখা। যা আজ আমি করে দিয়েছি। তুই আমাকে ওই দিন থাপ্পড় না মারলে হয়ত আমি দয়া করে তোকে বিয়ে করে নিতাম। কিন্তু এখন আমার জীবনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোকে কোন মতেই বিয়ে করবো না। আমি শুধু প্রতিশোধ নিয়েছি। এখন তোর যা করার তুই করতে পারিস। আমাকে জেলে দিতে চাস দিতে পারিস। তোর যা যা ইচ্ছা তুই করে দেখ আমার কিছু করতে পারিস কি না।

ইশিতা কোনো ভাবেই ইফান কে বুঝাতে পারলো না। ইফান আজ না বুঝে না জেনে কত বড় ভুল করছে। ইফান রিহার ফাঁদে পা দিয়েছে। ইশিতা রিহা কে বিশ্বাস করে ওই দিন ইফানের গায়ে হাত না তুললে ইফান প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এতটা নিচে নামতো না। নিজেকে প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে এতটা অন্ধ হতো না। ইফান ঠিক তার ভুল বুঝতে পারবে। ততদিনে তো কিছুই ঠিক থাকবে না। তখন ইফান চাইলেও কিছু ঠিক করতে পারবে না।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here