অদ্ভুত_মেয়ে (season 2)
Part- 6
Writer: #Nur_Nafisa
.
.
(এনগেজমেন্ট এর ১সপ্তাহ পর অর্থাৎ পরের শুক্রবার মামামামীরা এসেছে নাফিসাদের বাসায় বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করতে। আজ ছোটদের কাউকে নিয়ে আসা হয়নি। আপুরাও আসেনি। শুধু মাহিন ও ফাহিম ভাইয়া এসেছে। মেয়ের জামাই, তাই আলোচনায় তাদের রাখতেই হবে। বড়রা আলাপআলোচনা করে ৩ সপ্তাহ অর্থাৎ ২১দিন পর বিয়ের দিন ঠিক করলো। আজও নাফিসার সালামি মিস হয়নি ইমরানের পরিবার থেকে। মামারা চলে যাবার সময় নাফিসার বায়না করে মামাদের সাথে মামার বাড়ি যাবে! মামামামী নিয়ে যেতে রাজি কিন্তু নাফিসার মা যেতে দিতে রাজি না!)
মাহিন- এখন সেখানে যাবে কেন? বিয়ের পর তো সেখানেই থাকবে।
নাফিসা- আরে ভাইয়া কি বলেন! বিয়ের আগে নানুর বাড়ি বেড়াবো না! বিয়ের পর কি বেড়াতে পারবো! এটাই তো মেয়েদের সুযোগ বিয়ের আগে সব আত্মীয়ের বাসায় বেড়ানোর!
ফাহিম- হাহাহা…. তাহলে আমাদের বাসায় চলো।
নাফিসা- আপনাদের বাসায়ও যাবো, আগে নানু বাড়ি যাবো।
মা- আল্লাহ, এই মেয়ের মাথায় একটু বুদ্ধিসুদ্ধি দাও! পাগলীটা মানুষ হবে কবে!
নাফিসা- মা, আজব কথাবার্তা বলো তুমি! পাগল তো মানুষই হয়। পশুপাখি কি পাগল হয়!
সাঈদ- আপু নানুর বাড়ি গেলে আমিও যাবো।
নাফিসা- আমার সাথে এতো জোড়া কিসের? হ্যাঁ! আমি ভার্সিটি যাই, তুই যাবি আমার সাথে!
সাঈদ- হাহাহা…. নিয়ে গেলে তো যাবোই।
মা- হ্যাঁ যা, সব চলে যা। আমি একাই থাকি বাড়িতে। মায়ের প্রতি টান নেই একটা ছেলেমেয়েরও!
(কথাটা একটু খারাপ লাগলো নাফিসার তবুও ভ্রুক্ষেপ করলো না। মাথায় একবার ঢুকেছে নানুর বাড়ি যাবে, তো যাবেই। নাফিসার মাকে বড় মামা বুঝিয়ে রাজি করালো। সাঈদকে রেখে নাফিসাকে নিয়ে বিকেলে চলে গেলো নারায়ণগঞ্জ। হিমা হিয়া তো নাফিসাকে পেয়ে সেই খুশি! সন্ধ্যায় হিমা, হিয়া ও রেহান একসাথে পড়ছিলো নানুর রুমে আর নাফিসা তাদের সাথে বসে আছে। ইমরান তার রুমে যাওয়ার আগে এদিকটায় উকি দিয়ে নাফিসাকে দেখে হতম্বর!)
ইমরান- নাফিসা এখানে কিভাবে!
নাফিসা- ডানায় ভর ছাড়া উড়ে উড়ে…
ইমরান- ফোন হাতে কেন? পড়াশোনা নাই! বই সাথে উড়ে আসতে পারলো না!
নাফিসা- না!
ইমরান- ফাকিবাজ!
নাফিসা- ভালো হইছে, তোমার কি!
(ইমরান নিজের রুমে চলে গেলো। ইশার আযান দিলে হিমা হিয়াকে নিয়ে নাফিসা নামাজ আদায় করে নিলো।)
রেহান- আপু, নিচে আসো। আম্মু খাওয়ার জন্য ডাকছে।
নাফিসা- তুই যা, শান্তা আপুর সাথে কথা বলে আসছি।
রেহান- আচ্ছা।
(হিমা, হিয়া ও রেহান নিচে চলে গেলো। নানুর রুমের জানালার পাশে দাড়িয়ে নাফিসা শান্তা আপুকে কল করলো।)
নাফিসা- আসসালামু আলাইকুম।
শান্তা- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
নাফিসা- কি করছো?
শান্তা- টিভি দেখছিলাম। নানুর বাড়ি যাওয়া টা কি এখন বেশি প্রয়োজন ছিলো? মা বাসায় একা। কেউ একজন সাথে থাকলেও তো সময় টা কাটে দু’একটা কথা বলে।
নাফিসা- বাবু কি করে?
শান্তা- ঘুমায়।
নাফিসা- ডিনার করবো, রাখি এখন। আল্লাহ হাফেজ।
(কল কেটে নাফিসা জানালার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। রাস্তার পাশেই মামাদের দোতলা বাসা। নিচতলায় ৪রুম উপর তলায় ৪রুম। নিচতলায় ৩ রুম ৩ মামাদের আর ১টা মেহমান এলে থাকে। উপর তলায় সিড়ি দিয়ে উঠতেই নানুর রুম, নানু মারা যাওয়ার পর নাফিসারা বেড়াতে এলে যেখানে থাকে আর এমনিতে খালি থাকে। নানুর রুমের পাশেই বড় রুমটা ইমরানের। এখানে রুম এটাচড বাথরুম। এই দুইরুমের বিপরীতেও একইরকম। বড় রুমটা হিমা, হিয়া থাকে। আর ছোট রুমে রেহান। নানুর রুম আর ইমরানের রুম রাস্তার দিকটায়। নাফিসা একমনে বাইরে রাস্তায় তাকিয়ে আছে। বাসার একদম সামনাসামনি কোন দোকানপাট নেই তবে আশেপাশে আছে। গাড়িগুলো একটু পরপর হর্ন বেজে দৌড়াচ্ছে! এতোক্ষণ হয়ে যাবার পরও নাফিসা নিচে যাচ্ছে না তাই ইমরান উঠে এলো আবার ডাকতে। নাম ধরে ডাকতে ডাকতে দরজা দিয়ে রুমে প্রবেশ করলো ইমরান। ইমরানের ডাকে ধ্যান ভাংলো নাফিসার। কখন তার চোখে অশ্রু ভীড় জমিয়েছে খেয়ালই করেনি সে! ওড়না দিয়ে দ্রুত চোখ মুছে নিলো সে যা ইমরানের চোখ এড়ায়নি! ইমরান পাশে এসে দাড়াতেই নাফিসা স্বাভাবিক হয়ে বললো,)
নাফিসা- খেয়ে এসেছো?
ইমরান- না।
নাফিসা- চলো…
(ইমরানের দিকে না তাকিয়ে কথাটা বলতে বলতে নাফিসা দুকদম এগিয়ে এলে ইমরান নাফিসার হাত ধরে বাধা দিলো।)
ইমরান- হঠাৎ এখানে দাড়িয়ে কান্নার কারণ কি?
নাফিসা- কই!
ইমরান- অন্ধ না আমি।
নাফিসা- হাত ছাড়ো, নিচে যাবো।
ইমরান- কান্নার কারণ জানতে চাইছি।
নাফিসা- কাল সকালে আমাকে ঢাকায় দিয়ে আসতে পারবা?
ইমরান- নাফিসা, কেউ কিছু বলছে?
নাফিসা- উহুম।
ইমরান- তাহলে?
নাফিসা- প্লিজ কোন প্রশ্ন করো না এখন। ভালো লাগছে না কিছু! কারণ অন্যদিন বলবো। এখন বলো কাল ঢাকায় দিয়ে আসবা কিনা?
ইমরান- ওকে।
(এইটুকু সময়ে ইমরান নাফিসার দিকে তাকিয়ে কথা বললেও নাফিসা একবারের জন্যও ইমরানের দিকে তাকায়নি। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে ইমরানের সাথে নিচে গেলো ডিনার করতে।)
(খাওয়ার সময় অন্যদিন নাফিসা কথার ঝুড়ি খুলে বসে, কিন্তু আজ তার ব্যাতিক্রম। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। কেউ কোন প্রশ্ন করলে শুধু সংক্ষেপে তার উত্তর দিচ্ছে। খাওয়া শেষ করে হিমা হিয়ার সাথে তাদের রুমে ঘুমিয়েছে নাফিসা। নাফিসার কান্নার কারণ এখনো ইমরানকে ভাবাচ্ছে! হঠাৎ কি হলো তার! নিজের রুমে কিছুক্ষন পায়চারি করে হিমাদের রুমের দিকে গেলো ইমরান। অন্যদিন লাইট জ্বালানো থাকে। আজ নাফিসা আসায় রুমের লাইট অফ। ইমরান দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করে লাইট জ্বালিয়ে দেখলো ৩জনই ঘুমিয়ে আছে। নাফিসার পাশে গিয়ে তার চেহারা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না সে ঘুমানোর আগেও কেদেছে! চোখের ধারে পানি শুকিয়ে আছে। চুপচাপ লাইট নিভিয়ে দরজা চাপিয়ে ইমরান রুমে চলে এলো। শুয়ে শুয়ে তার ফোনে তোলা নাফিসার কিছু ছবি দেখতে লাগলো আর ভাবছে #অদ্ভুত_মেয়ে টা সবসময় সবাইকে হাসিখুশি রাখতে পারে আর সবার সামনে হাসিখুশি থাকার খুব ভালো অভিনয়ও করতে পারে। নিজের মাঝে কি ঝড় বইছে তার বিন্দুমাত্র লেস কাউকে বুঝতে দেয় না।
সকালে নামাজ পড়ে ইমরান আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। নাফিসার ডাকে ঘুম ভাঙলো তার। চোখ মেলেই দেখে নাফিসা বোরকা হিজাব পড়ে তৈরি! চমকে উঠে বসে ইমরান। অত:পর মনে হলো নাফিসা কাল ঢাকা যাওয়ার কথা বলেছিলো। বালিশের পাশ থেকে মোবাইল নিয়ে দেখলো মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে!)
ইমরান- এসব কি! হ্যাঁ? মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে এখনি রেডি হয়ে বসে আছিস!
নাফিসা- আমি এখনি যাবো।
ইমরান- মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর! বাড়ির সবাই কি ভাববে! কাল বিকেলে এসে আজ সকাল সকাল বের হয়ে যাচ্ছিস!
নাফিসা- কেউ কিছু ভাববে না। তুমি যাবে কিনা বলো, না হলে আমি একাই চলে যাবো।
ইমরান- নাস্তা করেছিস?
নাফিসা- না, বাসায় গিয়ে করবো।
ইমরান- নিচে যা, আমি আসছি।
(নাফিসাকে সকাল সকাল এ বেশে দেখে মামামামীরা সবাই অবাক! তাদের ধারণা তাদের ছেলেমেয়েদের সাথে কিছু হয়েছে। নাফিসা অনেক বুঝিয়ে বললো তার আজ ভার্সিটি যাওয়া জরুরি। পড়াশোনার ব্যাপারে সবাই সচেতন তাই আর আটকালো না। কিন্তু নাস্তা করিয়ে তারপর ছাড়লো। ইমরান নাফিসা দুজনেই নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লো। চাষারা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠলো। নাফিসা জানালার পাশে বসে আছে আর ইমরান তার পাশেই বসা।)
ইমরান- সত্যিই কি এখন বাসায় গিয়ে ভার্সিটি যাবি?
(নাফিসা কোন উত্তর না দেয়ায় ইমরান ধমক দিয়ে আবার একই প্রশ্ন করলো)
নাফিসা- না যাবো না ভার্সিটি।
ইমরান- কাল থেকে দেখছি এমন কেন করছিস! কি হয়েছে? কাউকে বলছিস না কেন কিছু?
নাফিসা- ভাইয়া, তোমার কি মনে হয় মায়ের প্রতি আমার কোনো টান নেই?
( ইমরান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নাফিসার দিকে।)
ইমরান- মায়ের প্রতি সন্তানের টান থাকবে না এটা কেমন কথা! আর তোর ক্ষেত্রে সেটা বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই!
নাফিসা- তাহলে কাল মা কেন বললো, “একটা সন্তানেরও মায়ের প্রতি টান নেই!”
(ইমরান কিছু না বুঝতে পেড়ে পুরো ঘটনা জানতে চাইলো। নাফিসা কালকের ঘটনা সব বললো। কথাগুলো বলতে বলতে নাফিসার চোখ জলে ভরে গেছে! ইমরান কি জবাব দিবে ভেবে পাচ্ছে না! নাফিসা বাইরের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলো।)
ইমরান- নাফিসা, এই সামান্য ব্যাপারে এতো রিয়েক্ট করার মানে হয়না। তুই এতোটা সিরিয়াস হলি কবে থেকে! আমি শিওর, ফুপি সিরিয়াস হয়ে কথাটা বলেনি। তুই নরমাল থাক, দেখবি সব নরমাল আছে।
(নাফিসা কিছু বললো না তাই ইমরানও চুপচাপ বসে রইলো, প্রায় দেড় ঘন্টা পর বাসায় পৌছাল।)
মা- ওমা! কাকে দেখছি আমি! কাল বিকেলে গিয়ে আজ সকাল সকাল চলে এলি কেন! এতো তারাতাড়ি বেড়ানোর সাধ মিটে গেছে?
নাফিসা- শান্তা আপু কল করে বললো তুমি নাকি আমার জন্য কান্না করছো! তাইতো ঘুম না ভাঙতে চলে এলাম।
মা- হাহাহা…. ঘুম ভাঙেনি এখনো?
নাফিসা- না।
( নাফিসা হাসিমুখে কথাগুলো বলে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। ইমরান ও নাফিসার মা হাসলো তার কথা শুনে।)
মা- ইমরান কি হয়েছে, বলতো? এতো সকালে কেন?
ইমরান- কি না কি বলে দিছো কাল। রাতে কান্নাকাটি করেছে, সকাল সকাল আমার ঘুম ভেঙে এখানে নিয়ে এসেছে।
মা- আমি আবার কি বললাম!
ইমরান- তোমার প্রতি নাকি কারো টান নেই!
মা- এই কথা! তাহলে গেলো কেন কাল?
ইমরান- সেটা তো তোমার অদ্ভুত মেয়েই জানে!
মা- বস, নাস্তা করে নে।
ইমরান- না, নাস্তা করেছি। আমার কাজ আছে আমি যাই। আল্লাহ হাফেজ।
মা- আরে বসবি তো একটু।
ইমরান- ফুপি, আমি এক জায়গায় যাবো। তুমি তোমার মেয়েকে সামলাও। আমি যাই….
(ইমরান চলে গেলে মা নাফিসার কাছে এলো।)
মা- এতো অভিমান এতো রাগ কবে সৃষ্টি হলো! না করলেই শুনিস কবে!
নাফিসা- গতকালও শুনিনি, আগামীকালও শুনবো না। দেখোনি! তাইতো তুমি না করা সত্ত্বেও চলে গেলাম!
মা- হাহাহা…. তা ফিরে এলি কেন?
নাফিসা- আমার ইচ্ছা।
মা- কষ্ট লাগছে আমার কথায়? কয়দিন পর বিয়ে হয়ে গেলে তো সেখানেই থাকবি। এই ক’টাদিন যাতে আমার সাথে থাকোস তাই যেতে না করছি।
(নাফিসা কতোক্ষন মাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। মনটা ভালো হলে আবার ছেড়ে দিয়ে বলতে লাগলো,)
নাফিসা- বেশি আবেগী হয়ো না তো! বাবা কোথায়?
মা- বাজারে।
নাফিসা- সাঈদ স্কুলে গেছে?
মা- হুম।
নাফিসা- কিছু বানাও খাই, না হয় বলো কি খাবে?
মা- হাহাহা…. আয় কিচেনে।
.
চলবে…..
.
.
[ ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে নিয়মিত গল্প দেয়ার চেষ্টা করবো। ডিয়ার পাঠকগন, নাফিসা আর ইমরানের বিয়েতে আপনাদের দাওয়াত রইলো। বিয়ের দিন/ তারিখ/ সময় কিছুই বলবো না। হঠাৎ করেই একদিন জেনে যাবেন “আজ ইমরান নাফিসার বিয়ে!” তাই কে কি গিফট দিবেন তা আগে থেকেই রেডি করে রাখুন। গিফট ছাড়া বিয়ে খেলে দাত পড়ে যাবে বলে দিলাম….! ]