অদ্ভুত_মেয়ে (season 2)
Part- 10
Writer: #Nur_Nafisa
.
.
শাড়ি দেখে ইমরানকে এখন আছড়াতে ইচ্ছে করছে নাফিসার! নিজের রুম থেকে গলা ছেড়ে শান্তা আপুকে ডাকতে লাগলো। শান্তা মাহিকে সাথে নিয়ে সাঈদকে পড়া দেখিয়ে দিচ্ছিলো। নাফিসার গলা শুনে মাহিকে নিয়ে নাফিসার রুমে এলো।
শান্তা- কি হয়েছে?
নাফিসা- দেখছো! বিয়ের জন্য কি শাড়ি কিনেছে ভাইয়া!
শান্তা- প্যাকেট না খুলেই শাড়ি দেখে ফেললি! প্যাকেট খুলে দেখা, দেখি কি শাড়ি কিনেছে!
নাফিসা- প্যাকেট খুলে কি দেখবা! কালার দেখে সন্তুষ্ট হও নাই? বিয়ের সময় কেউ সাদা শাড়ি দেয়?
শান্তা- এই যে, এটা লাল।
নাফিসা- এটা লাল, এটা সাদা কেন? ইমরাইন্নার খবর নিয়ে ছাড়বো আমি! একা একা শপিং করতে গেছে, আর এসব নিয়ে আসছে!
শান্তা- নাফিসা ভদ্রভাবে কথা বলবি।
নাফিসা- রাখো তোমার ভদ্রতা।
নাফিসা ফোন নিয়ে ইমরানের নম্বরে ডায়াল করলো।
ইমরান- হ্যালো।
নাফিসা- না করছিলাম না শাড়ি দিয়ে যেতে! এসব কি দিয়ে গেছো!শপিং করতে পারো না যখন, গেছো কেন একা একা! একটাও পড়বো না আমি। নিয়ে যাও এসব। একটা হলুদ, একটা লাল, একটা সাদা! বিয়ের শাড়ি সাদা হয় কখনো শুনেছো?
ইমরান- বিয়ের শাড়ি সাদা না। লালটা বিয়ের।
নাফিসা- তাহলে এই সাদা শাড়ি কিসের?
ইমরান- সাদাটা রিসিপশনের। আর এটা শাড়ি না, গাউন।
নাফিসা- গাউন হোক আর যা ই হোক, সাদা কেন? বিয়ের মধ্যে কেউ সাদা ড্রেস পড়ে? নীল টিল হলেও তো পারতো! রিসিপশন তো বিয়ের ই অংশ! বিধবাদের ড্রেস কেন? বিয়েতে সাদা ড্রেস পড়িয়ে বিধবা সাজাইবা আমাকে? লোকে যেন হেসে যায় আমাকে দেখে, সেই ব্যবস্থা করছো সাদা ড্রেস পাঠিয়ে?
শান্তা নাফিসার কথা শুনে হা করে আছে! এসব কি শোনাচ্ছে ভাইয়াকে! এদিকে ইমরান আর কিছু না বলে কল কেটে দিলো। নাফিসার মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিলো, ইমরান কল কাটায় আরো বেশি রেগে গিয়ে ফোন বিছানার উপর ঢিল মারলো! ইমরান নাফিসার কল কেটে দিয়ে শান্তার ফোনে কল করলো। সাঈদ এসে শান্তাকে ফোন দিয়ে গেলো।
শান্তা- হ্যাঁ ভাইয়া। বলো…
ইমরান- শান্তা নাফিসার কাছে গিয়ে দেখ সাদা ড্রেসের প্যাকেট টা খুলে ফেলেছে কি না!
শান্তা- প্যাকেট খুলেনি। আমি নাফিসার কাছেই আছি।
ইমরান- প্যাকেট টা তুলে রেখে দে। আমি এসে নিয়ে যাবো। আর নাফিসাকে বল রেডি হতে, আমি ঢাকায় আসছি। শপিংমলে যাবো।
শান্তা- এখন?
ইমরান- হ্যাঁ। যা বলছি তা কর।
শান্তা- আচ্ছা।
শান্তা ফোন রেখে নাফিসাকে বললো,
শান্তা- রেডি হয়ে যা। ভাইয়া ঢাকা আসছে তোকে নিয়ে শপিংমলে যাবে।
নাফিসা- বলে দাও তোমার ভাইয়াকে, কোথাও যাবো না আমি।
শান্তা- কেন? যাবি না কেন? এতোক্ষণ না যা তা বলে বকে যাচ্ছিলি! এখন তো তোর পছন্দে শপিং করতে যাবে।
নাফিসা- আগে নিতে পারলো না! তখন একা গেছে কেন? না করো আসতে। যাবো না আমি কোথাও।
শান্তা- ঢং দেখলে আর বাচি না!
শান্তা ইমরানকে আবার কল করে বললো,
শান্তা- ভাইয়া, এসো না শুধু শুধু। নাফিসা কোথাও যাবে না।
ইমরান- তাহলে জিজ্ঞেস কর, রিসিপশনের শাড়ি কি রঙের হবে?
শান্তা নাফিসাকে জিজ্ঞেস করতেই বললো,
নাফিসা- লাগবে না, শাড়ি। যেটা এনেছে সেটাই পড়বো।
শান্তা- ভাইয়া, সেটাও বলছে না।
ইমরান- আচ্ছা, তুই প্যাকেটটা তুলে রাখ তোর কাছে। খুলবি না সেটা।
শান্তা- আচ্ছা।
শান্তা কল কেটে দিলো। তারপর নাফিসাকে বললো,
শান্তা- ভাইয়ার সাথে এমন বিহেভ করা তোর উচিত হয়নি নাফিসা। পছন্দ যখন হয়নি, ভাইয়াকে ভালোভাবে বলতেই পারতি। এভাবে বলাতে ভাইয়া কষ্ট পেয়েছে।
শান্তা আর অপেক্ষা না করে সাদা ড্রেসের প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। নাফিসা রেগে বললো,
নাফিসা- হুহ্! ঢং! ভাইয়া কষ্ট পেয়েছে! ভাইয়া এসব এনেছে কেন? বিয়ের ড্রেস কেমন হয়, সেই ন্যূনতম বোধ কি ভাইয়ার নেই! যত্তসব!
রাত সাড়ে দশটার দিকে নাফিসার বাসায় কলিং বেল বাজলো। নাফিসার বাবা দরজা খুলে দেখলো ইমরান। ইমরান সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। নাফিসার বাবা জিজ্ঞেস করলো,
– ইমরান! এতো রাতে তুমি কোথা থেকে এলে?
ইমরান- ফুপা, নাফিসার ড্রেস আনতে ভুল হয়েছে। সেটাই চেঞ্জ করতে এলাম।
– ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে। এটা তো পরেও করতে পারতে! ইমরান- সমস্যা যত তাড়াতাড়ি সমাধান করা যায়, ততই ভালো। নাফিসা কোথায়? ঘুমিয়ে গেছে?
– না, এই মাত্রই খাবার খেয়ে রুমে গেলো।
ইমরান নাফিসার রুমে এলো। নাফিসা ঘুমানোর জন্য বিছানা ঠিক করছিলো, হঠাৎ ইমরানকে প্রবেশ করতে দেখে অবাক হলো! শান্তা ও এ রুমে ছিলো। ইমরান নাফিসার সামনে খাটের উপর প্যাকেট রেখে বললো,
ইমরান- দেখে নে, ঠিক আছে কি-না!
নাফিসা- কি এটা?
ইমরান- খুলে দেখ।
নাফিসা প্যাকেট খুলে দেখলো গাঢ় নীল রঙের গর্জিয়াছ জর্জেট শাড়ি!
নাফিসা- শাড়ি এনেছো কেন? বলেছি না আমার লাগবে না!
ইমরান- কাউকে বিধবা সাজানোর ইচ্ছে আমার নেই। শাড়িটা খুলে ভালো করে দেখ। পছন্দ না হলে বলিস চেঞ্জ করে আনবো। আর আল্লাহর কাছে একটু দোয়া করিস, আমার অল্প বয়সে যদি মৃত্যু আসে তাহলে যেন বিয়ের আগেই আসে। তাহলে আর তুই বিধবা হবি না। শান্তা, ওই প্যাকেটটা দে।
শান্তা প্যাকেট দেয়ার জন্য বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। পিছু পিছু ইমরানও বেরিয়ে গেলো। ইমরানের কথাটা তীরের মতো বিধেছে নাফিসার মনে। বুক ফেটে কান্না আসছে তার! জেদের বশে কি বলতে কি বলে ফেলেছিলো! ইমরান এতোটা আঘাত পাবে ভাবতেও পারেনি নাফিসা! দৌড়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো নাফিসা। দরজা লাগিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিশব্দে কাদতে লাগলো! ইমরান কম আঘাত পেয়ে কথাগুলো বলে যায়নি! সাদা ড্রেস দিয়েছিলো তো কি হয়েছে! চুপচাপ পড়ে নিলেই পারতো! কাউকে এতোটা আঘাত, এতোটা অপমান কিভাবে করতে পারলো সে! খুব খারাপ লাগছে নাফিসার! নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে তার! নিজেকে শেষ করে দিতে পারলে হয়তো শান্তি লাগতো এখন তার কাছে!
.
ইমরান সাদা ড্রেসটা নিয়ে রাতেই চলে গেলো নারায়ণগঞ্জ। ফুপা-ফুপি থেকে যেতে বলেছিলো কিন্তু থাকে নি। এমনকি একটু বসেও নি। যাওয়াটা জরুরি বলে মলিন হেসে বিদায় নিয়েছে ইমরান। নকল হাসিটা নাফিসার বাবা-মা বুঝতে না পারলেও শান্তা ঠিকই বুঝেছে। তবে এসব নিয়ে কাউকে কিছু বললো না। দুদিন পর বিয়ে, জানাজানি হলে ঝামেলা হতে পারে তাই ভেবে চুপ থাকলো। অন্যকারো ক্ষেত্রে কিছু না ঘটলেও, আজকের ব্যবহারের পর নাফিসার উপর ভরসা করতে পারছে না শান্তা! এই মেয়েটা হঠাৎ এমন হয়ে গেলো কিভাবে! শান্তা রুমে এসে নাফিসাকে দেখতে না পেয়ে বুঝতে পারলো সে ওয়াশরুমে। মাহিকে সাথে নিয়ে সে শুয়ে পড়লো। প্রায় দশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে রুমে এসেছে, এখনো নাফিসা বের হচ্ছে না ওয়াশরুম থেকে। তাই শান্তা নাফিসাকে ডাকতে লাগলো। শান্তার ডাকে নাফিসার ধ্যান ভাংলো! সে হাত-পা ঘুটিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় হেলান দিয়ে বসে আছে! সে তো দাঁড়ানো ছিলো, বসে পড়লো কখন! শান্তা আবার ডাকতেই নাফিসা উঠে চোখেমুখে ইচ্ছেমতো পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে এলো।
নাফিসা- ডাকছো কেন?
শান্তা- এতোক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে কি করছিস?
নাফিসা- ওয়াশরুমে মানুষ কি করতে যায়! ঘুমাও চুপচাপ। কথা বললে মাহি উঠে যাবে।
শান্তা চোখের পাতা বন্ধ করে ফেললো। নাফিসা মুখ মুছে হালকা পাউডার দিয়ে লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে খাটে এসে শুয়ে পড়লো। অনেক্ক্ষণ চোখ বুজে রইলো, কিন্তু ঘুম আসছে না! ইমরান কি বাসায় চলে গেছে! না, যেতেও তো ঘন্টার বেশি সময় লাগবে! বারবার সে কথাই মনে পড়ছে আর চোখ দিয়ে পানি পড়েই যাচ্ছে! নাফিসা চেষ্টা করেও কন্ট্রোল করতে পারছে না! বেশ কিছুক্ষণ পর মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো, বারোটা বাজে। এতোক্ষণে কি ইমরান বাসায় ফিরেছে! নাফিসার ইচ্ছে করছে ইমরানের সাথে কথা বলতে। কিন্তু কিভাবে বলবে! সে যে অত্যাধিক খারাপ ব্যবহার করেছে! মন মানছে না, তাই ইমরানের নম্বরে “sorry ” লিখে মেসেজ সেন্ট করলো। আরো বিশ মিনিটের মতো কেটে গেলো। কোনো রিপ্লাই নেই! নাফিসা শান্তা আপুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘুমিয়ে আছে। সে আস্তে করে খাট থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে ইমরানকে কল করলো। একবার রিং হলো কিন্তু রিসিভ হলো না। ইমরান কি ঘুমিয়ে গেছে! দ্বিতীয় বার ট্রাই করতেই কেটে দিলো। তারমানে ইমরান জেগে আছে। নাফিসা আশা নিয়ে কল করতেই লাগলো দুবার কেটে দিয়েছে এর পর বেজে চলেছে ঠিকই কিন্তু কাটছেও না, রিসিভও করছে না! সাইলেন্ট করে রেখেছে হয়তো! নাফিসা হতাশ হয়ে খাটে এসে শুয়ে পড়লো। আবার মেসেজ করলো, “সরি, এভাবে হার্ট করতে চাই নি তোমাকে!” কোন রিপ্লাই আসলো না! একটু পর পর “sorry” লিখে মেসেজ সেন্ট করতেই লাগলো। সাত আটটা পাঠাতেই ফোনের ব্যালেন্স শেষ! এবার মেসেঞ্জারে পাঠাতে লাগলো। সারারাত এভাবেই কাটিয়ে দিলো! এক মিনিটের জন্যও ঘুম আসেনি চোখে! আর না এসেছে ইমরানের কোন রিপ্লাই! ফজরের আযান দিলে উঠে নামাজ পড়ে নিলো! আজ আর কোরান পড়েনি! নামাজ পড়ে শান্তা আপুকে ডেকে দিলো নামাজ পড়ার জন্য। নাফিসা ছাদে চলে গেলো, এখনো আলো ফুটেনি বাইরে। অনেকটা অন্ধকার ই আছে। পূর্বাকাশে হালকা লাল আভা ছড়াচ্ছে। নাফিসা কিছুক্ষণ হাটাহাটি করলো তারপর একপাশে এসে রেলিং ধরে দাড়িয়ে রইলো। আস্তে আস্তে অন্ধকার কেটে আলো ফুটতে শুরু করেছে। নাফিসা ছাদে দাড়িয়ে থেকে আজ সূর্যোদয় দেখলো। নতুন লাল সূর্য দেখে মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো! আবার রুমে চলে এলে শান্তা আপু মাহিকে কোলে নিতে বললো। নাফিসা মাহিকে কোলে নিতেই শান্তা আপু বললো,
শান্তা- কি রে! তোর চোখ মুখ এমন ফোলা কেন?
নাফিসা- বেশি ঘুম হয়েছে হয়তো!
শান্তা আপু চলে গেলো, নাফিসা কিছুক্ষণ পর বড় মামির কাছে কল করে বললো বাসায় কাজ না থাকলে ইমরান ভাইয়াকে যেন আজ ঢাকা আসতে বলে। ভাইয়াকে দরকার আছে তাই না আসতে চাইলে জোর করে হলেও যেন পাঠায়। মামিও রাজি হয়ে গেল!