#বিভাবতীর_জীবন,পর্বঃ৫,৬
#লেখিকাঃতামান্না
#পর্বঃ৫
-“চুপ, জগতের সবাই খারাপ তোরাই সাধু!”
–“আমরা সাধুই বটে আপনার মত বিচার না করেই হুট করে কোন কাজ করিনা! একবার ও ভেবেছিলেন ভাবির এখন কি অবস্থা? কোথায় আছে তিনি, কি করছেন এই মুহুর্তে? কিছু জানেন? এই অবস্থায় একটা মেয়ে আজ প্রায় আটদিন নিখোঁজ! একদিন ও আপনি ওনার খোঁজ করেননি, কিভাবে পারলেন এতটা দিন তার খোজঁ না নিয়ে থাকতে? মেয়েটা শহর থেকে এসেছিল শুধু আপনার কথা রাখার জন্য। অন্য মেয়েরা যেখানে একটা স্টেপ নিতে গেলে হাজার বার ভাবে সেখানে কতটা সরল মনে মেয়েটা আপনার কাছে এসেছিল। আর আপনি কিনা মেয়েটাকে না বুঝেই মা আর বোনের কথা শুনেই তাকে তারিয়ে দিলেন। ”
–” মা বোনের কথা শুনে মানে? কি বলতে চাস? আমি আমার বোনের কথা শুনে যদি চলি ও তোর সমস্যা কি?
তুই ওর পক্ষে হয়ে এত সাফাই গাইতে আসছিস কেন? কি হয় তোর?” সবুজ রায়হানের কলার ধরে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে বলছে কথা গুলো।
–” আমার কিছু হয়না, মানুষ হিসেবে ও একটা মানুষের প্রতি মায়া থাকা উচিৎ তা বলছি।”
–” আরে রাখ তোর মায়া! মায়া দেখাতে আসছিস খুব।”
সবুজ রায়হানের গায়ে হাত তুলতে শুরু করে দিল। তুমুল বাকবিতণ্ডার মধ্যে রায়হানের মা আর সবুজের মা ও বোনের দৌড়ে নিজেদের ছেলেদের সরিয়ে নিলেও দুজনে যেন ক্ষ্যাপা ষাড় হয়েগেছে। সবুজকে জোর করে মিনা টেনে আনল। মিনা রায়হানকে দেখে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে কি দরদ। মিনা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বলল-
–” ভাইয়া ওদের কথা শুনিস না, কেউ ভালো চায় না আমাদের। একটু সুখের মুখ দেখছি এটা কেউ সহ্য করেনা। ঐ মেয়েটার চরিত্রের দোষ সবাই জানে তারপরও মেয়েটার হয়ে সাফাই গায়।”
ধরে ধরে দু পরিবার নিজেদের ছেলেদের টেনে নিয়ে আসলো। রায়হানের মা যেন লজ্জায় পরেগেলেন একদম সবুজের বউটা খুব ভালো, মেয়েটার খুব সরল! এমন মেয়ে এই ধরনের কোন কাজই করতে পারেনা। উনি বুঝাতে চাইলে পারছেন না সবাইকে কথাগুলো বলতে। বলার আগেই উনার ছেলের উপর দোষ দিয়ে দিল। লজ্জায় এখন মুখ খুলতে ও পারছেনা।
__________________________________
সীপে হেলান দিয়ে আজকাল বাহিরে তাকিয়ে থাকে বিভা।
পেটে হাত দিয়ে কখনও কখনও নিজে নিজেই কাদেঁ।
একদিন, এক সপ্তাহ, একমাস, পেরিয়ে ছয়মাস!
কত স্বপ্ন একটা গর্ভধারণ নিয়ে। প্রতিদিন যখন পেটের এই আকার ধারন করে তখন মনে একটা অন্যরকম আনন্দ হয়। মেয়েদের প্রথম আবদারের সময়টা থাকে বাবাকে নিয়ে পরের সময়টা স্বামীকে নিয়ে। একটা সময় আবদারের ঝুলিগুলো সরে গিয়ে হয়ে যায় নিজেরাই হয়ে যায় আবদার কারীর প্রধান শিকার। বিভা ও তো তেমন ছিল। বাবার কাছে যা পেত না মায়ের কাছে তা চাইতো।
স্বামীর কাছে আবদার তার ছিল খুবই ক্ষুদ্র!
একদম শেষ পর্যায় ক্রমে সে ও হতো আবদার কারীর শিকার। তাকেও কেউ শাড়ির আচঁল ধরে অথবা ওড়নার কোণায় টেনে টেনে বলতো। মা আমার এটা চাই ওটা চাই।
বেশিক্ষণ ভাবতে পারল না বিভা। বুকটা তার একটা হাহাকারে যেন জ্বলে যাচ্ছে। ভিষণ রকমের ভুল করেছে সে। যার সবচেয়ে বড় শিকার তার সন্তান। অন্যায় করেছে সে, আর ভোগ করেছে তার অনাগত সন্তান।
রেজওয়ান কেবিনের ভিতর ঢুকে দেখল বিভা বসে আছে বিছানায়। রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে সালাম দিতেই সে সালামের উত্তর নিল।
রেজওয়ান ভিতরে প্রবেশ করে বলল-
–” শরীর কেমন তোমার বিভা?”
–“ভালো ভাই,”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রেজওয়ান বলল-
–” ফুফা বাইরে দাড়িয়ে আছেন, ফুফি ও এসেছেন। তোমার সামনে কিভাবে আসবে, কিভাবে মুখ দেখাবে তা ভেবেই আসতে পারছে না।”
–” লজ্জা পাওয়ার মত তো তারা কোন কাজ করেনি রেজওয়ান ভাই। আমি বরং তাদের লজ্জিত করেছি।
আমার কারনে তারা মুখ দেখাতে পারছে না।
লজ্জাটা তাদের নয় আমার পাওয়ার দরকার। আমি তাদের মূল্য দেইনি লজ্জা আমার পাওয়ার দরকার।”
–” দেখো বিভা বিষয়টা এখন এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে আসলে তোমরা কেউই দোষী নও। এটা তোমাদের ভাগ্যের দোষ! একটা জিনিস মনে রাখবে পৃথিবীতে সবাই সুখী হয়না, ওরকম সুখীই যদি সবাই হতো তাহলে পৃথিবীর মত জটিল হতো না। মানুষ আর স্বর্গ খুজতো না পৃথিবীতেই থেকে যেত আজীবন। প্রত্যেকের জীবনে সুখ, দুঃখ থাকে। সুখের থেকে দুঃখের পাল্লাটা কারোর ভারি থাকে। কারো বা খুব কম। এই যে এখন তুমি যে পরিস্থিতে আছো হয়তো সামনে তোমার জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু আছে। ”
–” আমার জন্য আর বিশেষ ভালো কিছু আর আসবে না রেজওয়ান ভাই! আমার সুখ আমি আগেই হারিয়ে ফেলেছি। আমার কপালে আর সুখ আসবে না। যাদের নিয়ে জীবনে সুখের চিন্তা করেছি তারাই নেই জীবনে আমার আর কি সুখ থাকবে রেজওয়ান ভাই?”
রেজওয়ান আর উত্তর দিতে পারলো না। মেয়েটা কতটা গম্ভীর হয়েগেছে। হেসে হেসে দুষ্ট মিষ্টি কথা বলা মেয়েটা আর হাসে না।
এই তো বছর পাচেঁক বছর বয়স আগে বছর ষোলো কি সতেরো বছর কিশোরী কত দুষ্টুমি করতো। মিষ্টি হেসে সবার সঙ্গে কথা বলতো। প্রত্যেকটা কথায় ছিল একদম সরলতা মিশ্রিত। হঠাৎ রেজওয়ানের মনে হলো কেন বারবার সরল মনের মানুষগুলোই যত বিপদে পরে?
_____________________________
দুদিন থাকার পর রিলিজ দেওয়া হয়েছে হসপিটাল থেকে।
বিভাকে এসে ডাক্তার রিলিজ দিয়ে গেছে। বিভা রিলিজ পেপারে নিজে নিজে সাইন করল। বিভার বাবা এসেছেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে। বিছানা পত্র সব গুছিয়ে হসপিটালের আয়া দের বুঝিয়ে দিচ্ছিল মিলি।
কাগজ-পত্র থেকে শুরু করে ঔষধ পত্র সব কিছু গুছিয়ে নিচ্ছে সে। মিলি সব গুছিয়ে দরজার সামনে বিভার বাবাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বলে উঠল –
–” দাড়িয়ে আছেন কেন ফুফা? ভিতরে আসুন!”
প্রতিউত্তর করলেন না মশিউর সাহেব। কেবিনে ঢুকে বিভার সামনে দাড়িয়ে রইলেন। বিভা তখন বারান্দার পাশে একটা চেয়ারে বসে ছিল। খুব মলিন চেহারায় বাইরে চেয়ে আছে সে। মশিউর সাহেব গলাটা একবার পরিষ্কার করে ঝেড়ে ডেকে উঠলেন –
–” বিভা মা!”
আজ তিন বছর বাদে বিভার সঙ্গে মা নামের সুন্দর একটা ডাক শুনতে পেল বিভা। খুব করুণ একটা ডাক, বাবা কি খুব কষ্টে আছেন। মলিন হওয়া চেহেরাটা নিয়ে পিছন ফিরে দেখল তার বাবা মশিউর রহমান চেয়ে আছেন ।
বারান্দার দিকে ফিরে বলল-
–” জ্বী বাবা বল,”
–” আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলবি না? আমি কি এতই খারাপ? ”
বিভা পিছন ফিরে অবাক চোখে তাকালো বাবার দিকে। তারপর তার কি হলো সে ঐ চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বাবাকে দৌড়ে জড়িয়ে ধরল। তিনটা বছর পর আজ মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরেছে বুঝতেই মশিউর রহমানের খালি বুকটা কেমন ভরে উঠলো। বিভা কান্না করছে বাবার বুকে মাথা দিয়ে। সেই কান্না কোন অভিমান মিশ্রিত কান্না নয় বুক ভাসিয়ে হেচকি দিয়ে দিয়ে কাদঁছে সে। মশিউর সাহেবের বুকে মাথা দিয়েই সে কেদেঁ কেদেঁ বলছে –
–” বাবা তুমি খারাপ না, আমি খারাপ! আমি তোমার সন্তান হয়েও সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।
তোমার বিশ্বাসের মূল্যায়ন না করে আমি চলে গিয়েছিলাম। জানো তো বাবা আমি একটা কথা বেশ বুঝতে পারলাম আজ, তোমাদের বুক খালি করেছি বলেই হয়তো আমার সন্তান আমার কাছে নেই। আমার কলিজার টুকরো আমার কাছে নেই। আমি খুব বড় অন্যায় করেছি। এখন আমার সব সময় মনে হয় এই জীবনে আমার আর তেমন কিছু হবে না। কাদতেঁ কাদতেঁ বিভা খানিকটা চুপ থেকে বলল –
–“বাবা আমি কাকে নিয়ে বাচবোঁ? যার জন্য আমি সব ছেড়ে পালিয়ে আসছি সেই তো নেই। তোমার আর মায়ের অশ্রুর কারনে আমার এমন হয়নি তো? বাবা আমার ছয়মাস গর্ভে থাকা সন্তান নেই বলেই আমার এমন হাহাকার লাগছে। তোমার তো আঠারো বছর মানুষ করা সন্তান ছিলাম আমি। কত আদরে তুমি আমাকে বড় করেছো। কত স্নেহ কত মায়া মমতায় তুমি আমায় লালন-পালন করেছো।তোমার তো এর থেকে ও বেশি কষ্ট হয়েছিল! আমি তোমাদেরকে এত বড় আঘাত করে ফেললাম নিজের অজান্তে এত বড় আঘাত তোমাদের করে ফেললাম। যার সাজা আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াবো!
চলবে।
#বিভাবতীর_জীবন
#লেখিকাঃতামান্না
#পর্বঃ৬
আমি তোমাদেরকে এত বড় আঘাত করে ফেললাম নিজের অজান্তে এত বড় আঘাত তোমাদের করে ফেললাম। যার সাজা আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াবো!
মশিউর সাহেব কোন প্রতিউত্তর করলেন না। মেয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে বলতে লাগলেন
-” শান্ত হও মা! শান্ত হও! তুই ভুল করেছিস নিজের অজান্তেই করেছিস, জেনেবুঝে কেউ ভুল করে না।
আমার খুব কষ্ট হয়েছিল যেদিন তুই হঠাৎ আমাকে ফোন করে বললি তুই বিয়ে করে নিয়েছিস। আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ করে এমন কিছু করবি আমি ভাবতে পারিনি। শত হলেও তুই আমার একমাত্র সন্তান। তোর কিছু হলে বা কিছু শুনলে আমার খুব কষ্ট হয়। তুই যদি আমাদের জানিয়ে দিতি তোর ভালোবাসার মানুষ আছে আমি কারোর কথা শুনতাম না তোকে হয়তো তার কাছেই বিয়ে দিয়ে দিতাম। কিন্তু তুই ভুলটা করলি আমাকে না জানিয়ে কথাটা গোপন করে ওকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে।”
বিভা বাবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কত বড় ভুল সে করল সে নিজেই জানে না। আজ তার একটা ভুলের জন্য তার জীবনটা ধ্বংস হয়েগেল।
বিভার বাবা হাসপাতালের যাবতীয় কগজপত্র সব ঠিক করে মেয়েকে নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে।
পথে বাবার গাড়িতে বাবার বুকের উপর মাথা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। রমনা পার্কে আজ বুঝি কোন অনুষ্ঠান?
হঠাৎ মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল আজ ভ্যালেনটাইন ডে। রমনীরা নিজেদের সঙ্গীদের হাত ধরে বসে আছে ঘাসে। হাতে ফুল নিয়ে যে যার মত হাটছে। বিভা ভাবতে লাগল এমন করে সে ও তো একবার কলেজ ফাকি দিয়ে সবুজের সঙ্গে এই পার্কে এসেছিল।
কত কথা সেদিন তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছিল।
কথার ঝুড়ি যেন সেদিন দুজনার শেষই হচ্ছিল না। আর আজ দুজন দুই প্রান্তে। বিভা বাবার চোখের আড়ালে চোখের পানিটা মুছে মনেমনে বলল-
–” ভুল করেছিলাম ভুলের মাশুল দিলাম।
আর কখনও তোমার স্মৃতি মনের মাঝে আনবো না।
এটাই শেষ, ভালো থেকো তুমি। তোমার আমার সম্পর্কের শেষ আমি আজ থেকে শুরু করব!”
____________________________________
তিনবছর বাদে নিজ বাড়িতে পা দিয়েছে বিভা। ডুপ্লেক্স করা বাড়ী, মশিউর সাহেব কত শখ করে করেছিলেন বাড়িটি। বিভা মাত্র একমাস থেকে ছিল বাড়িটিতে নতুন বাড়ী এটি। পুরোনো বাড়িটা সাততলা ওটা পুরোটাই ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বিভার আর তার মায়ের শখ পূরণের জন্যই এই বাড়িতে অবস্থান। বিভার বাবা বিভাকে নিয়ে এসেছে বাড়িটিতে। বিভা কিছুক্ষণ পুরো বাড়িটিতে চোখ বুলিয়ে দেখল। তারপর রুমে ঢুকেই সব ছুয়ে ছুয়ে দেখতে লাগল রুমটা। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বাবা রুমে এসে বলল –
–” তোর যা যা আছে সব এই রুমেই আছে, কিছুই বদলায়নি শুধু তুই মানুষটাই ছিলি না।”
–” রুমটা কে পরিষ্কার করেছে বাবা? তিনবছরে তো এত পরিষ্কার থাকার কথা না একটা রুম। এত নিট আর ক্লিন!”
–” এগুলো তোর মা কাজের লোক দিয়ে পরিষ্কার করিয়েছে। ”
–” মা আমার সাথে কথা বলবে না বাবা?”
—” মাকে কেন লাগবে? আমি আছি কিসের জন্য? তোর মায়ের কোন কথা বলতে হবে না। থাকুক পরে নিজের মানসম্মান নিয়ে।”
–” এভাবে বলো না বাবা, মা যা করেছে তা সব মা-বাবারাই করে। আমি ভুল করেছি তাই মা আমার উপর রেগে আছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মশিউর সাহেব চুপ করে রইলেন এর মাঝেই বিভা বলে উঠলো –
–” বাবা একটা কথা বলার ছিল।”
–“বল,”
–” আমি সবুজকে ডিভোর্স দিতে চাই। যত তাড়াতাড়ি পারি সম্পর্কটা মিটমাট করে ফেলতে। এভাবে ঝুলে থাকতে আর পারব না। ”
–” তুই যা ভালো ভাবিস তাই কর! আমি তোকে কোন বাধা দিব না। ”
–” তাহলে কালকে ব্যবস্থা কর সব কিছুর। আমি জীবনটাকে নিজের মত ঘুছিয়ে নেব। ”
–” অবশ্যই পারবি। আমি তাহলে কালকেই কথা বলছি, আর সব কাগজপত্র ঠিক করছি।”
________________________________
বিভা এসেছে প্রায় দুদিন হলো। এর মধ্যে ডিভোর্সের কাগজ পত্র সব কিছু পাঠিয়ে দিয়েছে সাইন করে।
জীবনে বিশ্বাসটা খুব প্রয়োজনীয় জিনিস। সম্পর্কে যখন একবার বিশ্বাস ভেঙ্গে যায় তখন সব শেষ হয়ে যায়।
ভালোবাসা ও তখন আস্তে আস্তে মানুষের মন থেকে সরে যায়। বিভা নিজের মনে কল্পনা করতে লাগল আর ভাবতে লাগল। সবুজের কথাগুলো হ্যা এগুলো সবুজই বলেছিল তাকে। সবুজই তাকে সাহস দিয়ে বলেছিল একবার হাতটা ধরে এগিয়ে আসো। বিশ্বাস করো কখনও তুমি ঠকবে না।
আমি তোমাকে কখনও ঠকাবো না। কত সুন্দর করে সবুজ তাকে বুঝিয়ে বলতো কথা গুলো। বিভার অবুঝ মন যখন ভাবতো পরিবার নিয়ে তখন সবুজই বলতো সব। সেই মানুষ কি করে এক মুখ দিয়েই এমন করে আবার অন্য কথা বলে? বিভা ভাবতে ভাবতে হেসে দিল আশর্চয্য পাগল হলো নাকি সে? পরে ভাবলো হাস্যকর ও তো বটে অদ্ভূত না? বিভা চিন্তা করতে লাগল এসব ভেবে তার কাজ নেই। বিভার ফোনে কল আসতেই দেখল সবুজের ফোন। বিভা ফোনটা সুইচড অফ করে ফেলল। সবুজ কাল রাতে ডিভোর্স লেটার পাওয়ার পরই তাকে ফোন দিয়ে অকথ্য ভাষায় কথা বলেছে। কিন্তু বিভা কিছুই বলেনি উত্তরে শুধু বলেছে –
–” চরিত্রের দোষ দিয়ে বের করেছো বাড়ির থেকে।
এবার একজন সৎ, মা বোনের কথা শুনে, মাসে মাসে শশুর বাড়ী থেকে টাকা দেয় এমন কাউকে ঘরে তুলে নিয়ে এসো। কিন্তু দয়া করে ঐ মেয়েটাকে গর্ভাবস্থায় বাড়ি থেকে পালাতে না হয়। মানি খুন করার পরিকল্পনা করাটা অন্তত করো না। আর তোমার নিজের সন্তানের তো একদমই না।”
–” আমি খুন করতে চেয়েছি? কি বলতে চাও এসব?”
–” প্রশ্নটা আমাকে করো না, বিবেককে করো! উত্তর পেয়ে যাবে! রাখলাম।”
সবুজ বিভার কথাগুলো শুনে কিছুটা অবাক হলো। পরে আবার রেগেগেল সে মেয়েটা তাকে খুনি বলল। বিভার এমন হুটকরে ডিভোর্স দেওয়াটা তার হজম হচ্ছে না। এতটা পরিমান সাহস একটা মেয়ের। পরে আবার ফোন করলেও ফোনটা বন্ধ। মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর বিভার প্রতি রেগে উঠল সে, মায়ের কিছু কথা শুনে সে ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিল। রাখবে না সে বিভাকে।
____________________________
এনজিওতে যোগ দিয়েছে বিভা উদ্দেশ্য নিজেকে একটু ব্যাস্ত রাখার। বাসায় বসে থাকলে সারাদিন তার অবচেতন মন সব সময়ই বাচ্চাটার কথা ভাবে। বাচ্চটার একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল, ওকে নিয়েই তো সারাটা জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দিত পারতো। কিন্তু সেই সন্তান ও আজ নেই। বিভা সেসব থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যই এনজিওতে জয়েন দিয়েছে। ছোটখাটো একটা এনজিওতে জয়েন দিয়েছে বলেই আজ বিভার বাইরে আসতে হয়েছে। এনজিওয়ের কাজ কিছুটা টাফ বাইরে বেড়িয়ে কত অসহায় শিশুদের কাছে তাকে ঘুরতে হয়।
শরীরে দূর্বলতার ছাপ নিয়েই ঘুরছে সে।
পুরো শরীরই দূর্বল তবুও সে ঘরে থাকবে না। রাতটুকু ও তার জন্য কেমন বিষাক্ত রুপ ধারন করে। এই কটা দিন সে কতখানি বালিশ ভিজিয়েছে চোখের জল দিয়ে তা হয়তো কেউ দেখেনি। কিন্তু সে তো জানে ভিতরে ভিতরে কতটা সে গুমড়ে মরে।
___________________________________
জানালার গ্রীল ধরে ফোনে কথা বলছে বিভা।
একটু আগেই সে বাড়িতে ফিরেছে। ফোনের অপর প্রান্তে রায়হানের মা কথা বলছেন। সবুজ বাড়ী ফিরে রায়হানকে অকারনে মেরেছে, সঙ্গে রায়হানের সঙ্গে বিভার সম্পর্কে নানা ধরনের মন্তব্য করেছে সবই তিনি বলতে লিগলেন । বিভা এগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। দীর্ঘশ্বাসই তো তার এখন সঙ্গী। একটা মানুষ কতটা বদলেগেলে আর কতটা খারাপ হলে এইভাবে না জেনেই মন্তব্য করতে পারে।
সবুজ রায়হানকে জড়িয়ে এই ধরনের কথা বলবে সে ভাবতে পারেনি। কথা বলতে বলতে তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন আর কি ফিরবে না সবুজের সংসারে? তুমি তো সবুজকে ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছ। বিভার উত্তর ছিল –
–” ভেঙ্গে যাওয়া জিনিস হয়তো জোড়া দেওয়া যায়।
বিশ্বাস আর কখনও জোড়া দেওয়া যায় না চাচি!”
চলবে।