আমি_মায়াবতী #পর্ব_২৫ #লেখনীতে_তাহমিনা_মিনা

0
110

#আমি_মায়াবতী
#পর্ব_২৫
#লেখনীতে_তাহমিনা_মিনা

“তোকে কখন থেকে কল দিচ্ছি মায়া। ফোন ধরছিলি না কেন?”
“রিল্যাক্স কবিতা। অল্পতেই এতো হাইপার কেন হোস? একটু রয়ে সয়ে কথা বল।”
“আজাইরা কথা বলিস না তো। ফোন ধরছিলি না কেন তাই বল?”
“কবিতা, এইটা গ্রাম। তুই জানিস না, এইখানকার নিয়ম কি রকম। আমার হাতে মোবাইল দেখে এখানকার সবাই অবাক হয়ে গেছে। এখানে নাকি মেয়েদের হাতে মোবাইল দিতে হয়না। তাহলে নাকি মেয়েরা খারাপ হয়ে যায়। বুঝলি?” বলেই হাহা করে হেসে উঠলো মায়া। মায়ার কথা শুনে অবাক হয়ে কবিতা বলে,”মানে কি এইসবের? খারাপ কেন হবে?”
“আরেহ, এ তো গেল মোবাইলের ব্যাপারে। কোনো মেয়ে যদি ফেইসবুক চালায়, তাহলে নাকি সে অবশ্যই খারাপ হয়ে গেছে। তার সাথে আর অন্য মেয়েদের মিশা বারণ। ”
“সিরিয়াসলি? এইটা কোনো কথা? কই গিয়ে পড়লি তুই?”
“আর বলিস না। যতোসব আজগুবি নিয়ম।”
“কতদিন থাকবি তুই ঐ পাগলের গ্রামে?”
“জানিনা। তবে, এই কয়েকটা বিষয় ছাড়া বাকি সবকিছুই ঠিক আছে। গ্রামের মানুষ কি রকম বুঝলিই তো। এখানে এসে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সাবিহা। অথচ ও কিন্তু এখানে আসতেই চায়নি। আম্মা ওকে মজা করে বলেছে কালকেই চলে যাবো। কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।”
“কি কি করলি আজকে তাই বল।”
“অনেক মজা করেছি। আমার একটা ফুপাতো বোনও আছে। ওর নাম রিজা। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে।”
“আর তোর কাকাতো ভাই-বোনেরা নেই?”
“আছে। কিন্তু ওরা অনেক ছোট সবাই। আর একজন আছে। পাশের বাড়ির একটা মেয়ে ওর নাম মরিয়ম। জানিস ওকে সবাই এখানে কি নামে ডাকে?”
“কি নামে?”
“মইরম।”
কবিতা হাহা করে হাসতে থাকে মায়ার কথা শুনে। হাসতে হাসতেই বলে,”ও যদি শহরে থাকতো, আমরা ওকে ডাকতাম মারিয়াম বলে। তাইনা?”
“মনে হয় তাই ডাকতাম।”
“এখন কি করছিস?”
“ফুপি মুড়ি মাখিয়েছে। তাই খাচ্ছিলাম আর সবার সাথে গল্প করছিলাম। তুই ফোন দিলি তাই আসলাম।”
“ওহ। তাহলে তো বিরক্ত করলাম তোকে।”
“আজাইরা কথা কইস না তো। এমনিতেই কারেন্ট নাই। সন্ধ্যার পর গেছে তো গেছেই। আসার আর খবর নাই।”
“তাহলে আছিস কিভাবে? গরম লাগছে না?”
“নাহ। ততোটা গরম নেই এখানে। শহরে তো একটু সময়ের জন্য কারেন্ট গেলে জান বের হয়ে যায়। এখানে ততোটা গরম না থাকলেও আমরা কেউই এই অন্ধকার সহ্য করতে পারছিনা। কেমন একটা যে অন্ধকার এখানে। তবে, হারিকেন আছে।”
“তাহলে তো ভালোমন্দ সব অভিজ্ঞতাই হচ্ছে।”
“হুমম। তা বলতে পারিস।”
“মায়া।”
“হ্যাঁ, বল।”
“তোকে একটা কথা বলার ছিল।”
“বাহ। সূর্য কোনদিকে উঠেছে আজ? তুই আবার পার্মিশন নিচ্ছিস যে?”
“আরেহ, সিরিয়াস ম্যাটার।”
“আচ্ছা, বল।”
“আজ কাব্য ভাইয়া বলেছে আমাকে আমার নিজের বাড়িতে বেড়াতে যেতে।”
“তো? যা না। তোর ভাই-বোনদের দেখে আয়। ”
“বিষয়টি অতো সহজ না।”
“কেন?”
“তুই কি আমার কথা শুনিসনি?”
“কি কথা?”
“কাব্য ভাইয়া আমাকে বেড়াতে যেতে বলেছে। আমার নিজের বাড়িতে আমি বেড়াতে যাবো। এইটা কি আমার জন্য লজ্জাজনক না? আর তাছাড়া… ”
মায়া কিছু সময় চুপ করে রইলো। সে বুঝতে পারলো কবিতার কেমন অনুভব হচ্ছে। কিন্তু মুখে শুধু বললো,”আর তাছাড়া কি?”
“আরিয়ানের নানা বাড়ি থেকে মানুষ আসে। আমার দিকে কিভাবে যেন তাকায়। যেন আমি কোনো ভিনদেশের অতিথি। ওদের জন্য আমার ভালো লাগে না। আর আরিয়ানের এক খালাতো ভাই আছে, আমাকে ভীষণ বিরক্ত করে। আমার সহ্য হয় না।”
“শোন, আমার আম্মা কি বলেছে জানিস? আম্মা বলেছে আমরা কোনো বয়ামে যখন কোনো কিছু রাখি, তখন বারবার বয়ামটা ঝাঁকি দিয়ে নিই। যাতে আমরা নিজেদের জায়গা নিজেরা তৈরি করে নিতে পারি। আর তুই যেখানে যাচ্ছিস, সেটা তোর বাড়ি। তোর বাবার বাড়ি। তোর মায়ের বাড়ি। তোর মা ঐ বাড়ির বউ ছিল। তার একমাত্র অংশ তুই। ঐ বাড়িতে আরিয়ানদের যতোটা অধিকার আছে, তোরও ততোটাই অধিকার আছে।”
“হুমম। বুঝেছি।”
“যাচ্ছিস তাহলে?”
“দেখি। ”
“জানিস আমাদের এলাকার একজন মুরুব্বি এসেছেন। উনি আমাদের বাড়িতেই আছেন। উনার কথা বলতে সমস্যা হয় মনে হয়। উনি কখনোই কখনো বলে না। বলে কখনু।”
“মানে? কি সব হাবিজাবি বলছিস?”
“আরেহ, ও কার আর উ কারের পার্থক্য বুঝে না। আমরা বলি শোনো। উনি বলে শুনু। সাবিহা ওনার মতো করেই কথা বলছে। উনার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। উনার মতো করে কথা বলেই।”
কবিতা এবার হাহা করে হেসে উঠে।
“ওকে। যা এখন। মজা কর।”
“ওকে। গুড নাইট।”
“গুড নাইট মায়া।”
মায়া কবিতার ফোন রেখে আবার বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে। সে সেখান থেকে চলে যেতেই একটা ছায়ামূর্তিও চলে যায়। যেটা ও লক্ষ্য করতে পারে না। মায়া বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখে সাবিহা এখনও ঐ দাদাটার সাথে কথা বলছে। দাদাটা কি যেন বলছে আর সাবিহা খিলখিল করে হাসছে। সে শুনতে পেল দাদাটা বলছে,”মুক্তিযুদ্ধর সময় আমি বিয়া করছিলাম। বুঝছাও নি? আয় হায়, কি যে জামেলা? বাপে কইলু আইজকেই বিয়া অইবু। আমি কি কই তার কোনো মূল্য নাই। বিয়া অইবু আমার। আর কাম কাজ সব তাগুর। বুঝছাও নি?”
সাবিহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,”তারপুর কি অইলু? বিয়া করছেন?”
“হু। না কইরা উপায় আছেনি? বাপেরে মেলা ডরাইতুম। তুমার দাদায় জানে। বিয়া করলুম তার ১ মাস পরেই বউ থুইয়া গেলাম কত কত জায়গায়। যুদ্ধু শেষ কইরা আইসা দেহি আমার বউ বাড়িত নাই। শ্বশুর বাড়িত গেছে গা। আমি যাইয়া দেহি, আমার একটা ছাওয়াল অইছে। বুঝছাও নি কামকাজ?আমি তো কই কি থিকা কি অইয়া গেল? বউ তো শরমে আমার কাছেই আইলু না সাতদিন। কি যে শরমের কতা। কি আর কমু তুমারে নাতনি।”
মায়ার বেশ ভালো লাগছিল এদের গল্প শুনতে। হঠাৎ আকাশের দিকে নজর পড়লো তার। ছোট ছোট তারারা কিভাবে ঝিকিমিকি করে জ্বলছে আর নিভছে। কি মায়াময় একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। মায়ের কথা মনে পড়লো মায়ার। তাদের মফস্বল শহরে কারেন্ট চলে গেলে মাঝে মাঝে সে আর তার মা ছাদে উঠে সময় কাটাতো। সে এভাবেই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতো, আকাশের সবকিছুই মায়া বুঝলে তো মা? তা না হলে সবকিছু শুধু দেখা যাবে কেন? কেন তবে একটা বারের জন্যও হাত দিয়ে ধরা ছোঁয়া যাবে না?
মা হেসে বলতো, তুমিও তো মায়া। আমার মায়াবতী মা।
মায়া চোখে কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করতো,#আমি_মায়াবতী?
মাও হেসে জবাব দিত, হ্যাঁ তো।
মাঝে মাঝে আকাশ থেকে কোনো তারা খসে পড়লে মায়ার মা মায়াকে বলতো, একটা উইশ করো মায়া। যেকোনো একটা উইশ করো। মায়ার মা জানতে পারেনি কখনো, মায়া সবসময় একটা জিনিসই চাইতো। সেটা হচ্ছে, একটা পরিপূর্ণ পরিবার।
মায়া কি কখনো ভেবেছিল, তার উইশটা পূর্ণ হবে। কিন্তু সেখানে তার মা থাকবে না। তবে কি সে এই উইশটা করতো কখনো আল্লাহর কাছে? হয়তো কখনোই করতো না। মায়া হঠাৎ খেয়াল করে আজও একটা তারা খসে পড়ছে। মায়া আনমনেই বলে উঠে,”আমার মাকে জান্নাতবাসী করো আল্লাহ। তার সব পাপ ক্ষমা করে দিও তুমি।”
★★★
রাত দশটা। কাব্য নিজের বন্ধুদের সাথে প্ল্যান করছিল গরমের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায়। হঠাৎ একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। কাব্য ভাবে এতো রাতে কে কল দিবে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই কলটা রিসিভ করে সে।
” হ্যালো, কে বলছেন?”
“আমি… আমি…আসলে…”
একটা নারীকন্ঠের কথায় কাব্য বলে,
“আমি টা কে?”
“আমি…আমি মায়া।”
কাব্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,”মায়া? কবিতার বান্ধবী মায়া?”
মায়া রিনরিনে গলায় বলে,”হ্যাঁ, আমি মায়া।”
“এতো রাতে কল দিয়েছো? কোনো সমস্যা হয়েছে? আমি তো জানি তুমি গ্রামে গিয়েছো। তুমি ঠিক আছো তো ?” উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে কাব্য।
“আমি ঠিক আছি। ”
“তাহলে এতো রাতে কল দিলে যে?”
“আসলে আমি কবিতাকে নিয়ে কথা বলতে কল দিয়েছিলাম।”
“কেন? আবার কারো প্রেমে পড়েছে নাকি? নাকি আবার আমার বন্ধু কে প্রোপোজ করার কথা ভাবছে?”
মায়া হেসে বলে,”না। সেইসব বিষয়ে না।”
“তাহলে?”
“ওকে তো আপনারা ওর বাড়িতে যেতে বলেছেন। কিন্তু সেখানে যেতে ও নিরাপদবোধ করছে না।”
কাব্য অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “নিরাপদবোধ করছেনা মানে কি?”
“মানে হচ্ছে আরিয়ানের নানাবাড়ির মানুষ ওকে ভালো চোখে দেখেনা। তাছাড়া…”
“তাছাড়া কি?”
“তাছাড়া আরিয়ানের খালাতো ভাইয়ের ব্যবহার খারাপ। ও নিরাপদবোধ করে না। আসলে আমি বলতে চাইছি…”
“বুঝেছি মায়া। যা করার আমি করবো।”
“আচ্ছা। আচ্ছা আমি এখন রাখি।”
“এইটা কোনো কথা? যাকে ফোন দিলে তার খবর নিলে না?”
“না মানে আমি অবশ্যই নিতাম। কিন্তু আপনি….”
“আমি? আমি কি?”
“ভালো আছেন স্যার?” কথা ঘুরানোর জন্য বলে মায়া।
মুচকি হেসে কাব্য বলে,”ভালো আছি মায়া। আশা করি তুমিও ভালো আছো।”
“হুমম। ”
কিছুক্ষণ দুজনের মাঝে নিরবতা বিরাজ করে। কাব্যই বলে,”শুভরাত্রি , মায়া।”
মায়া শুধু হুমম বলে কল কেটে দেয়।
কাব্যর দুইরকম অনুভূতি হচ্ছে। আরিয়ানের খালাতো ভাইকে ইচ্ছে করছে ধরে খুন করতে। আবার মায়ার মায়াবী কন্ঠের হাতছানি তাকে সুন্দর একটা মুহুর্তের কথা ভাবতে বাধ্য করছে। কাব্যর ভাবতে ভালো লাগছে। আচ্ছা, সে কি তবে প্রেমে পড়েই গেলো? কিন্তু মায়া তার ছাত্রী। কাব্যর মুখ থেকে আনমনেই বের হয়ে আসে,”উফফ মায়া, তুমি কি আর কোনো কলেজ খুঁজে পাওনি ভর্তি হওয়ার জন্য? তোমাকে আমার কলেজেই কেন ভর্তি হতে হলো?”

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here