আষাঢ়ে_শ্রাবণের_বর্ষণ #মাইশারুল_মিহির [পর্ব-০৩]

0
2535

#আষাঢ়ে_শ্রাবণের_বর্ষণ
#মাইশারুল_মিহির

[পর্ব-০৩]

জৈষ্ঠমাসের শেষের দিকে সূর্যের অসহনীয় তাপ। গমগমে হয়ে আছে পরিবেশ। প্রচন্ড গরমে হাহাকার করছে চারপাশ। ভোর হতে না হতেই যেন সূর্য তার রশ্মি দিয়ে চারপাশে উত্তপ্ত করে দিয়েছে। এখন বোধহয় সকাল আটটা কি সাড়ে আটটা বাজে । আবরার হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বনানীর ক্লাবের সামনে চলে এসেছে খেয়ালই নেই তার। বনানী ১৮ নাম্বার সড়কে এই পার্কটি অবস্থিত। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো একবার। অনেক সময় বাহিরে কাটিয়েছে। এবার যাবার পালা। পকেট থেকে মোবাইল বের করে অভ্রকে লোকেশন সেন্ড করে দিলো। এতোক্ষণ হাঁটার ফলে বেশ হাঁপিয়ে গেছে সে। রাস্তার অপর পাশে দোকানের দিম্র এগিয়ে গিয়ে একটা পানির বোতল কিনলো। তারপর দোকান থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে মাথা থেকে হুডি ফেলে মাক্স খুলে পানি খেয়ে নিলো। তারপর আবার তাড়াতাড়ি করে মক্স পরে নিয়েছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ খেয়াল করে নি তাকে। ফুঁশ করে স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো একটা। হঠাৎ-ই তারই পাশে দাঁড়ানো একটা পিচ্চি ছেলের দিকে নজর গেলো তার। খেয়াল করে দেখলো ছেলেটি তার দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি তার দিকে সন্দেহপ্রবন চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি আবরার জুহায়ের? সিঙ্গার রাইট?’

আবরার প্রথমে অবাক হলো পিচ্চির এমন ভাব দেখে। পরোক্ষনে এক গাল হেসে উঠলো। হাঁটু গেড়ে বসে পিচ্চির গুলুমুলু গাল টেনে বললো, ‘ইয়াহ লিটল বয়। আই এম।’

গাল টানায় বাচ্চাটা বিরক্তি হলো সেটা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। ছেলেটি বুকে হাত গুঁজে গম্ভীর কন্ঠে বললো, ‘আই এম নট লিটল বয় এন্ড উইথ আউট মাই পারমিশন আমার গালে নেক্সট টাইমে হাত দিবে না।’

আবরার এবার বিস্ময় হয়ে গেলো। এইটুকু বাচ্চার চরম লেভেলের এটিটিউট। আবরার ঠোঁট আরো প্রসারিত করে হাসলো। বললো, ‘তোমার নাম কি?’

ছেলেটা গম্ভীর মুখে উত্তর দিলো, ‘সুফিয়ান। আই’ম সুফিয়ান রয়। একদিন তোমার মতোই বড় সিঙ্গার হবো।’

আবরার আদর করতে আবারো গাল টান দিতে হাত আগালো। সুফিয়ান চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে। আবরার হেসে হাত থামিয়ে বললো, ‘বাহ্ সুফিয়ান রয়। দোয়া করি তুমিও একদিন বড় নামকরা গায়ক হবে।’

তখনি কুর্তি পরা এক অর্ধবয়সের নারী এসে সুফিয়ানের হাত ধরলো। অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো, ‘সুফি তুমি এখানে কি করছো? কখন থেকে তোমাকে খুঁজছি।’

সুফিয়ান বিরক্ত হয়ে মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিলো। চেহারা বিবর্ণ করে বললো, ‘উফফ মাম্মাহ্ আই’ম নট সুফি। সুফিয়ান রয়। বলতে কষ্ট হলে এসআর ডাকতে পারো লাইক এবির মতো। তাই না এবি?’

শেষের কথা গুলো আবরারের দিকে তাকিয়ে বললো সুফিয়ান। আবরার মাক্সের ভিতরে নিঃশব্দে হাসলো। তারপর সুফিয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে বললো, ‘অফকোর্স মিঃ এসআর।’

মহিলাটি আবরারের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বললো, ‘সরি আপনাকে বিরক্ত করার জন্য। আসলে সুফিয়ান একটু বেশি দুষ্টু।’

আবরার দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো, ‘ইট’স ওকে। এসআর উরফে সুফিয়ান রয়ের সাথে কথা বলে আমার নিজেরও ভালো লেগেছে। তা সুফিয়ান রয় আপনার যদি সময় হয় তাহলে এক কাপ কফি হবে এই এবির সাথে। কি বলেন?’ বলেই ডান হাত বাড়িয়ে দিলো সুফিয়ানের দিকে। সুফিয়ান হেসে হ্যান্ডসেক করে বললো, ‘ইয়াহ্! ওয়ান ডে ইনশাআল্লাহ!’

ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসায় আবরারের কথোপকথন এখানেই সমাপ্তি ঘটলো। সুফিয়ানকে হাত উঠিয়ে টাটা দিয়ে চলে গেলো আবরার। মহিলাটি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে কারণ আবরার গাড়িতে উঠার আগে মাক্স খুলেছিলো। এতো বড় একজন গায়ক অহংকার ছাড়া রাস্তায় বসে কথা বলছিলো ভাবতেই অবাক লাগছে তার। সে নিজেও তো এবির অনেক বড় ফ্যান।
_________________

কলেজে প্রথম ক্লাস শেষে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে রিমি, নুরা আর দীবা। কারনটা হলো কলেজের ম্যাথম্যাটিক্যাল টিচার মুফতাহির রাজ! বয়স বেশি না। সাবিতের সসমবয়সী হবে বোধহয়। প্রচুর রাগি, গম্ভীর্যপূর্ন মানুষ। এখন তারই ক্লাস হবে তাও আবার হায়ার ম্যাথম্যাটিকস। পড়াবে যতোটুকু তার তিন গুন বেশি ধ’ম’কা’বে। উনাকে রীতিমতো সকল স্টুডেন্টস ভয় পায়।

নুরা গালে হাত রেখে বসে আছে। অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে তার চেহারায়। মলিন কন্ঠে বলে উঠলো, ‘দোস্ত আয় টিসি নিয়ে নেই। এই আলুর দমের ক্লাস আর ভাল্লাগে না।’

রিমি চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। ভ্রুঁ নাচিয়ে বললো, ‘কেনো কেনো? এখন ভাল্লাগে না কেনো? তুই না উনার উপর ক্রাশ খাইছিলি? প্রথম দিন তো রীতিমত লাফালাফি করছিলি। এখন সেই লাফ গেলো কই?’

নুরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো রিমির দিকে। পাশ থেকে দীবা ঠোঁট চেপে হাসলো। নুরাকে পচাঁনি দিয়ে বললো, ‘সেই লাফ স্যারের ধমকে ফুড়ুৎ হয়ে গেছে।’ রিমি উচ্চস্বরে হেসে ফেললো। নুরা ঠোঁট উল্টে বসে আছে। মুনতাহির রাজ স্যারের উপর ক্রাশ হয়ে বহুত জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল করেছে সে। তবে যাই হোক, লোকটা মাত্রারিক্ত কিউট। উফফফ’

বেশকিছু সময় পর মুনতাহির রাজ ক্লাসে আসায় সকল শিক্ষার্থী তাকে সম্মান জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ালো। রাজ এক পলক সবার দিকে তাকিয়ে ক্লাস করানো শুরু করলো। মনোযোগী হয় সকল শিক্ষার্থী। কিন্তু নুরা মনোযোগ সহকারে রাজকে দেখতে ব্যস্ত।
___________________

সন্ধ্যার আকাশে গোধূলির আবিরে রাঙ্গা স্নিগ্ধ পরিবেশ মাতিয়ে তুলছে চারপাশ। দিনের আলো নিভে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসলো ধরনীতে। আকাশে বিশাল থালা ন্যায় চাঁদটা উঁকি দিয়ে তার জ্যোৎস্নায় মাখিয়ে রেখেছে রাত্রী। আকাশে উড়ন্ত কিছু পক্ষী ঢানা ঝাপটিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। আর কিছু পক্ষী তার নিজ গন্তব্যস্থলে বসে কিচিরমিচির ডাকছে। সোডিয়ামের রঙবেরঙের কৃত্তিম আলো ছাদের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অপরাহ্নে অম্বরে স্বচ্ছন্দ চাঁদটা তার আপন জ্যোৎস্নায় ছাদের আনাচে কানাচে মিশিয়ে দিয়েছে। চারপাশ নিরব নিস্থব্ধ হলেও মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে ‘শান্তিনিবাস’ থেকে। ছাদে পাটি বিছিয়ে বসে আছে বাড়ির ছোটরা। নিশিতা তাদের পপর্কন, ঝালমুড়ি দিয়ে গেছে কিছুক্ষন আগে। কেউ পপর্কন খাচ্ছে; তো কেউ ঝালমুড়ি।

নুরা হাল্কা কেশে উঠলো সবার দৃষ্টি আকর্ষন করতে। সবাই তার দিকে তাকাতেই সে বললো, ‘এভাবে বোরনেন্স ফিল না করে আসো গেমস খেলি।’

আরিয়ান ত্যাচ্ছিল্য ভাবে হাসলো। পাটিতে আধশোয়া অবস্থায় বসে ত্যাঁছড়া ভাবে বললো, ‘তোরা যেমন গাদা তোদের বলা গেমসও আবলা মার্কা। পারবো না কোনো গেমস টেমস খেলতে। চুপ যা।’

তেঁতে উঠে রিমি। দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বললো, ‘খেলতে পারো না সেটা বলো শুধু শুধু গেমসের দোহাই কেনো দিচ্ছো?’

আরিয়ান মুখ ত্যাড়া করে ভেংচি কাটলো। রাইমা দাঁত কেলিয়ে বলে উঠলো, ‘কথায় আছে না নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা।’

আবারো হাসিতে মুখরিত হলো সবাই। আরিয়ান চোখ পাকিয়ে তাকালো রাইমার দিকে। সাবিত নড়েচড়ে বসে নুরার উদ্দেশ্যে বললো, ‘কি খেলা?’

নুরা বললো, ‘চুর পুলিশ খেলবো। ভালো হবে না?’ নুরা কে থামিয়ে আরিয়ান আড় চোখে তাকিয়ে বললো, ‘এহ চুর ডাকাত হওয়ার সখ নাই। আজাইরা খেলা।’

দীবা অনুনয় স্বরে বললো, ‘আরু ভাইয়া প্লিজ অনেক মজা হবে। না করো না।’

আরিয়ান লম্বা হাই তুলে বললো, ‘দীবা বলেছে তাই রাজি হয়েছি ওকে? নাহলে তোদের এই ফালতু খেলায় আরিয়ান জুবাইদ কখনোই রাজি হতো না।’

রিমি ভেংচি কেটে বললো, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ দীবাই তো তোমার বোন। আমরা তো কেউ না।’

আরিয়ান প্রতিত্তুরে দাঁত কেলিয়ে বললো, ‘আসলেই তো। তোদের শীতাকুন্ড পাহারের নিচ থেকে পেয়েছিলো আব্বু। তোরা আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া বোন। কি সাবিত ভাই?’

সাবিত স্বজোড়ে হেসে ফেলে। এক হাতে আরিয়ানের পিঠে চাপড় বসালো। রাইমা রাগান্বিত হয়ে পপর্কনের বাটি মেঝে রেখে বলে উঠলো, ‘রিমি অফ যা। এই হাদারাম গুলার সাথে কথা বলার চেয়ে কচুগাছে লেপ্টে থেকে কথা বলা ভালো।’

ফোঁড়ন কাটলো দীবা, ‘কিন্তু নুরা চুর পুলিশতো চার জন খেলে। আমরা মোট ছয় জন।’

নুরা বললো, ‘তাহলে রাজা রানী খেলি। ছয় জনই থাকবে। রাজা, রানী, মন্ত্রী, সেনাপতি, প্রহরী, প্রজা। রাজার পয়েন্ট বেশি থাকবে, রাজার থেকে কম রানীর, তার থেকে কম মন্ত্রীর, এভাবে সিরিয়ালে পয়েন্ট কমবে। খেলা শেষে যে প্রজা হবে মানে যার পয়েন্ট কম হবে সে হারবে। আর যে হারবে সে উইনার দের কথা অনুযায়ী শাস্তি পাবে। কেমন হবে??’

সবাই একসাথে বলে উঠলো, ‘বেশ হবে!’

নুরা উঠে নিজের রুম থেকে খাতা কলম নিয়ে আসলো। সাদা কাগজ ছিঁড়ে ছয়টা ছোট ছোট টুকরা করে তাতে নাম লিখে ভাজ করে নিলো। তারপর খেলা শুরু হলো। নুরা কয়েকবার রাজা পেয়েছে তো কয়েকবার বাকি গুলো। সাবিত, রাইমা, রিমি, দীবাও রাজা পেয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু বেচারা আরিয়ান প্রহরী আর প্রজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুখ ফুলিয়ে বারবার কাগজ উঠাচ্ছে। অবশেষে খেলা শেষ হলো। সাবিত কে কত পয়েন্ট পেয়েছে তা গুনছে। সবাই অধিক আগ্রহ নিয়ে বসে আছে রেজাল্ট জানতে।

আরিয়ান হতাশার নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘আমি যে লাড্ডু পাইছি সেটা আগে থেকেই জানি।’

নুরা বললো, ‘এতো আগ্রহ নিয়ে পরিক্ষার রেজাল্টের জন্যও অপেক্ষা করি নি।’

অবশেষে সাবিত গণনা শেষে সবার পয়েন্ট বললো। রাজা হয়েছে নুরা, রানী দীবা, মন্ত্রী সাবিত, সেনাপতি রিমি, প্রহরী রাইমা আর প্রজা হয়েছে আরিয়ান। নুরা দীবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘ওহ বেবি তুমি আমার রানী; আমি তোমার রাজা। আহ আসো জমিয়ে রোমান্স করি।’

‘ভাইয়ের শাস্তি কি হবে এবার?’ বললো রাইমা। তারপর সকলে ভাবতে লাগলো আসলেই আরিয়ানকে কি শাস্তি দেয়া যায়? পাঁচজন কিছুক্ষন আলোচনা করার পর রিমি আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বললো, ‘ভাই তোর শাস্তি হলো তুই একা হাতে, কারোর সাহায্য না নিয়ে আমাদের বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়াবি। তোর হাতের রান্না সেই ভাই।’

সবাই সাথে সম্মতি জানালো। আরিয়ানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো তাৎক্ষনাৎ। নাঃকোচ করে বলে উঠলো, ‘জীবনেও না। কারোর সাহায্য ছাড়া কিভাবে করবো? এটলিস্ট রেসিপি গুলা তৈরি করতে আম্মু নাহয় ছোট আম্মুকে, নয়তো কমলা আন্টির সাহায্য নেই।’

‘না মানে না।’ সবাই এক সাথে বললো। অগ্যত রাজি হতে হলো আরিয়ান কে।

চলমান…

নোট : আব্বুর অসুস্থ। ভোরে নরসিংদী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছি। গতকাল থেকে আমারো জ্বর। এতোটা পথ জার্নি, আবার অসুস্থতা সব মিলিয়ে মন খারাপ। তবুও গল্প দিয়েছি। আজকের পর্বটা বেখাপ্পা, অগোছালো হয়েছে। দুঃখিত। হ্যাপি রিডিং।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here